বরগুনা প্রতিনিধি: ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার উপকূলীয় জনপদে এখনো কাটেনি দুর্ভোগ। ভাঙা বেড়িবাঁধ, লবণাক্ত জমি, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও জীবিকা সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ।
পূর্বে বিষখালী নদী, পশ্চিমে সুন্দরবনসংলগ্ন বলেশ্বর নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত পাথরঘাটা উপজেলা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের মে মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ ২৬ মে সন্ধ্যা থেকে ২৭ মে সকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানে। এতে পাথরঘাটার বেশ কয়েকটি উপকূলীয় ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ, পানিবন্দি হয়ে পড়ে শত শত পরিবার। মাছের ঘের, কৃষিজমি ও বসতঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তীব্র আকার ধারণ করে সুপেয় পানির সংকট।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক পরিবার এখনো ঘরবাড়ি মেরামত করতে পারেনি। অনেক কৃষিজমিতে এখনো লবণাক্ততার কারণে স্বাভাবিক ফলন হচ্ছে না। পাশাপাশি নদীভাঙনের আতঙ্কও রয়ে গেছে।
চরদুয়ানি ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদুয়ানি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “রেমাল আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। এখনো ঋণ করে সংসার চালাতে হচ্ছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। আজও ঘর ঠিক করতে পারিনি।”
পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের চরলাঠিমারা গ্রামের ইদ্রিস মিয়া বলেন, “রেমালের ক্ষতি যার হয়নি সে বুঝবে না কষ্ট কতটা। বেড়িবাঁধ ভেঙে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়। লবণাক্ত পানির প্রভাব এখনো কৃষিজমিতে রয়ে গেছে। ফলে ফসলের ফলন ভালো হচ্ছে না।”
স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনএসএস’র নির্বাহী পরিচালক সাহাবুদ্দিন পান্না বলেন, “রেমালে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং দীর্ঘদিন সুপেয় পানি সরবরাহ করা হয়েছে। তবে উপকূলে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত স্থায়ী উদ্যোগ প্রয়োজন।”
বরগুনার আরডিএফ’র পরিচালক এনামুল হোসেন বলেন, “রেমালে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকশ পরিবারকে টয়লেট ও শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বেশিরভাগই বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায়। তাই টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ জরুরি।”
উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, “সিডরসহ অতীতের যেকোনো ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় রেমালের পর উপকূলে দীর্ঘ সময় পানি স্থায়ী ছিল। লবণাক্ত সেই পানি কৃষিজমি ও মাটির ব্যাপক ক্ষতি করেছে, যার প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি কৃষকরা।”
তিনি আরও বলেন, “একটি দেশকে টেকসইভাবে গড়ে তুলতে হলে উপকূল রক্ষা করতে হবে। এজন্য টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও উপকূলীয় বনায়নের কোনো বিকল্প নেই।”
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News