আতিকুর রহমান ইশতি, বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গ্রাম আদালত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও সেবার পরিধি বিস্তারে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এক উচ্চপর্যায়ের অর্ধ-বার্ষিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
৩ জুন ২০২৬ তারিখ সকাল ১১টায় বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী সম্মেলন কক্ষে গ্রাম আদালত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ অর্ধ-বার্ষিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক অনিমেষ বিশ্বাস। সভায় বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প (পর্যায়-৩) এর ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার রকিবুল ইসলাম এবং জেলার সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ উপস্থিত ছিলেন। সভার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল গ্রাম আদালতের বিদ্যমান কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সেবার মান আরও উন্নত ও কার্যকর করা। মূলত স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির এই মাধ্যমটিকে অধিকতর গতিশীল এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই ছিল এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য।
সভায় উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে গ্রাম আদালত পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অনিমেষ বিশ্বাস স্পষ্টভাবে জানান যে, গ্রাম আদালতকে শুধুমাত্র দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত করতে হবে। তিনি বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে স্থানীয় পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেন। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষ যাতে খুব সহজে এবং স্বল্প সময়ে ন্যায়বিচার পান, তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জানান, গ্রাম আদালতের কার্যক্রমে অস্বচ্ছতা বা উদাসীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গ্রাম আদালতের সেবার মানোন্নয়নে গণসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার রকিবুল ইসলাম সভায় জানান যে, প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাধারণ মানুষকে গ্রাম আদালতের আইনি সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করার জন্য নিয়মিত প্রচারণার ব্যবস্থা করা হবে। সভায় উপস্থিত সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নিজ নিজ এলাকায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে, বিচারক ও গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়, যাতে তারা আইনগত বিষয়গুলো আরও পেশাদারিত্বের সাথে মোকাবিলা করতে পারেন।
পরিশেষে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গ্রাম আদালতকে একটি কার্যকর বিচারিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সমন্বয় সভার মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বরগুনা জেলায় বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের হয়রানি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। গ্রাম আদালতের কার্যক্রম গতিশীল করার এই উদ্যোগ কেবল স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতেই সহায়ক হবে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। সভায় গৃহীত কর্মপরিকল্পনাগুলোর নিয়মিত তদারকি এবং পরবর্তী সমন্বয় সভায় এর অগ্রগতির প্রতিবেদন উপস্থাপনের মাধ্যমে গ্রাম আদালতের সেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News