নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা: উপকূলীয় জেলা বরগুনার নদী-খালনির্ভর প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ব্যবস্থা এখন চরম হুমকির মুখে। একসময় শতাধিক খালের প্রবাহে সচল থাকা এ জনপদ আজ দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং দীর্ঘদিন খনন না হওয়ার কারণে কার্যত পানিবদ্ধতার ফাঁদে আটকে পড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেলার অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গুরুত্বপূর্ণ খাল অবিলম্বে খনন বা পুনঃখনন না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি বরগুনা জেলার নামকরণ হয়েছে বড় বড় নৌকা এর মালিকরা গুণ টানতো এসব নদীতে বিস্তৃত এলাকায়, এতটাই বিখ্যাত ছিল বরগুনা নদীর জন্য।
জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ভাড়ানি খাল, খাকদোন নদী-সংযুক্ত খালসমূহ, বুড়িরচর খাল, বড় ও ছোট লবণগোলা খাল, নাপিতখালী, সোনাখালী, চড়কগাছিয়া, কামরাবাদ, হাজারবিঘা, গোলবুনিয়া, বাঁশবুনিয়া, নলটোনা, কেওড়াবুনিয়া খালসহ আমতলী, পাথরঘাটা, তালতলী ও বেতাগীর বিভিন্ন খাল বর্তমানে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। এসব খালের অনেকাংশ প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে, আবার কোথাও পলি জমে পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ছে।
একসময় জেলার পানি নিষ্কাশনের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত ভাড়ানি খাল খাকদোন নদীর সঙ্গে সংযুক্ত থেকে পায়রা নদীতে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করত। কিন্তু বর্তমানে খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বরগুনা পৌর শহরে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। একইভাবে খাকদোন নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় এর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোর পানিপ্রবাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা পুরো জলব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে।
সরকারি হিসাবে গত কয়েক বছরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক খাল খননের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবতায় সেসব প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে! প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, অপরিকল্পিত খনন, প্রয়োজনীয় গভীরতা বজায় না রাখা এবং খননের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ খাল অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও টেকসই সুফল মিলছে না। বিগত দিনে আওয়ামী লীগ শাসনামলে খাল খনন এবং ফান্ড সবই পাওয়া গিয়েছে কিন্তু নামে বেনামে এসব কাজ কাগজে কলমে দেখিয়ে বেশিরভাগেরই বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়ে গিয়েছে! কাজের কাজ কিছুই হয়নি অযথা সরকারের অর্থ অপচয় হয়েছে,
এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও জেলায় লবণাক্ততা ও পানি নিষ্কাশন সংকট বাড়ছে। খালগুলো সচল না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না, ফলে কৃষিজমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও পলি জমে ভরাট হওয়ার কারণে বরগুনার প্রায় চার শতাধিক খালের বড় অংশই অস্তিত্ব সংকটে। এর মধ্যে অন্তত ২৪৩টি খাল দখল ও ভরাটের কারণে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। খাকদোন নদীর প্রশস্ততা সোয়া কিলোমিটার থেকে কমে প্রায় ২৫০ মিটারে নেমে এসেছে, আর ভাড়ানি খালসহ অনেক খাল এখন মৃতপ্রায় নালায় পরিণত হয়েছে।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সেচ সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে হাজার হাজার একর জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব, স্লুইসগেট নির্মাণ, বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ এবং স্থাপনা নির্মাণ খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে।
পরিবেশ ও জনজীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুকনো মৌসুমে তীব্র পানির সংকট এখন নিত্যসঙ্গী। প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস হওয়ায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, আর একসময়ের ব্যস্ত নৌপথগুলো এখন প্রায় অচল।
যদিও পাথরঘাটা ও তালতলীতে কিছু এলাকায় খাল পুনঃখননের ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে বরগুনা জেলার অধিকাংশ খাল উদ্ধারে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের অনেক অভাব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খনন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, দখলমুক্তকরণ, নিয়মিত ড্রেজিং এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।
বরগুনার টেকসই উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানিবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা স্থায়ী পানিবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়ে প্রায় দুই শতাধিক খানের লিস্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে, এবং নতুন সরকার কৃষি এবং শেচ ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, সেক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আমরা আশাবাদী বরগুনা জেলায় কৃষি উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব এখনো।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News