লেখক ও সাংবাদিক - রেজাউল টিটু: একসময় বিস্তীর্ণ সুন্দরবন, চরাঞ্চল ও পতিত জমিতে আচ্ছাদিত বর্তমান বরগুনা জেলার একটি বড় অংশ মাত্র ২৭ টাকা ৫০ পয়সা বার্ষিক রাজস্বের বিনিময়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায় পেয়েছিলেন ঝালকাঠির কীর্তিপাশার জমিদার রাম জীবন রায়। ১৮০২ সালে ইংরেজ শাসনামলে সম্পন্ন হওয়া এই বন্দোবস্তকে ঘিরে এখনও নানা ঐতিহাসিক তথ্য, জনশ্রুতি ও বিতর্ক বিদ্যমান।
পলাশীর যুদ্ধের আগে বরগুনা, পটুয়াখালী ও বাকেরগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চল ছিল জমিদার আগা বাখের খানের অধীন। ১৭৫৪ সালে রাজনৈতিক সংঘাতের এক পর্যায়ে আগা বাখের খান নিহত হলে তার বিশাল জমিদারি বাজেয়াপ্ত হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী প্রায় তিন দশক কোম্পানি ইজারা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ অঞ্চল পরিচালনা করলেও স্থায়ী মালিকানার অভাবে রাজস্ব আদায়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে "Regulation I of 1793" জারি করেন, যা বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারের জন্য নির্দিষ্ট রাজস্ব নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং ইজারা ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা দূর করা। এই আইনের আওতায় পুরোনো জমিদার, তালুকদার বা সর্বোচ্চ রাজস্ব দিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থায়ী বন্দোবস্ত করার বিধান রাখা হয়।
১৮০২ সালে বাকেরগঞ্জ কালেক্টরেট আগা বাখের খানের পুরোনো জমিদারির অংশগুলো নিলামে তোলে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল "ইদিলপুর এস্টেট", যার আওতায় বর্তমান বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন অংশের পাশাপাশি বরগুনার আমতলী, তালতলী, সদর ও বেতাগী এলাকার বিস্তীর্ণ ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল। নিলামের শর্ত অনুযায়ী পতিত ও জঙ্গলাকীর্ণ জমি আবাদযোগ্য করে প্রজা বসানোর দায়িত্ব গ্রহণের বিনিময়ে রাম জীবন রায় বার্ষিক মাত্র ২৭ টাকা ৫০ পয়সা রাজস্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। অন্য জমিদাররা ঝুঁকির কারণে আগ্রহ না দেখানোয় তিনি সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে জমিদারির স্বত্ব লাভ করেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিকদের মতে, তৎকালীন বরগুনার অধিকাংশ জমিই ছিল সুন্দরবন, লবণাক্ত চর ও পতিত ভূমি। আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কম থাকায় রাজস্বও ছিল নামমাত্র। এছাড়া জঙ্গল পরিষ্কার, বাঘ-কুমিরের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং নতুন জনবসতি গড়ে তোলার ব্যয় বিবেচনায় ব্রিটিশ প্রশাসন কম হারে রাজস্ব নির্ধারণ করেছিল।
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, রাম জীবন রায় পরবর্তীতে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সাড়ে তিন লাখ একর সম্পত্তি প্রায় ১২ হাজার ১৭৩ টাকায় নিলামের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করেন। বৃহত্তর যশোর ও ফরিদপুর অঞ্চল থেকে লোক এনে জঙ্গল পরিষ্কার ও আবাদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জনশ্রুতি রয়েছে, কীর্তিপাশা জমিদার পরিবারের জমিদারি প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে টিকে ছিল এবং প্রজাদের ওপর কঠোর অত্যাচার চালানো হতো। ইংরেজ সরকারের জরিপকারী, চিকিৎসক ও ভূগোলবিদ ড. ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিলটন এ অঞ্চলে এসে জমিদারদের অত্যাচারের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
এছাড়া কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ির ভেতরে "মৃত্যুকূপ" নামে পরিচিত একটি স্থানের কথাও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, যেখানে অবাধ্য প্রজাদের আটকে রাখা হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে এসব ঘটনার বিষয়ে স্বাধীন ও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক নথির প্রয়োজন রয়েছে বলে গবেষকরা মনে করেন।
ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমলের শুরু পর্যন্ত রাম জীবন রায়ের উত্তরসূরিরা জমিদারি পরিচালনা করেন। ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
ইতিহাসবিদদের মতে, মাত্র ২৭ টাকা ৫০ পয়সায় বরগুনা "বিক্রি" হয়নি; বরং নির্দিষ্ট বার্ষিক রাজস্বের ভিত্তিতে একটি বৃহৎ কিন্তু অনুন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ওপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আবাদ বৃদ্ধি ও জনবসতি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ছবি: ঝালকাঠির কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত "মৃত্যুকূপ"।
তথ্যসূত্র: ঐতিহাসিক দলিল, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন (১৭৯৩), স্থানীয় ইতিহাস ও গবেষকদের বিবরণ।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News