বরগুনা প্রতিনিধি: গত বুধবার (৩ জুন২০২৬ তাং) বিকেলে বরগুনা জেলা পরিষদের ডাক-বাংলোর তৃতীয় তলার দুটি পৃথক কক্ষ থেকে "ইতি রাণী" এবং তার দুই শিশুকন্যা "আরাধা বিশ্বাস" ও "অনুরাধা বিশ্বাসে"র মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নিহত ইতি রাণী ওই ডাকবাংলোতে খণ্ডকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার এলাকার এবং স্থানীয়রা একে নিছক আত্মহত্যা হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও বরগুনা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করলেও ঘটনার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ময়নাতদন্ত পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। মূলত, একই পরিবারের তিন সদস্যের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং ডাকবাংলোর মতো সুরক্ষিত স্থানে এমন নিরাপত্তা বিচ্যুতি পুরো জেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কর্মচারীরা মরদেহগুলো দেখতে পেয়ে পুলিশকে অবহিত করলে বিষয়টি প্রকাশ পায়, যার পর থেকেই স্থানীয় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ এবং স্থানীয়দের ভাস্য অনুযায়ী, ইতি রাণী ও তার দুই কন্যাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে! নিহতের স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, তার স্ত্রী আত্মহত্যা করার মতো কোনো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না এবং শিশুদের হত্যার ঘটনাটি এটি যে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড তার অকাট্য প্রমাণ। বিক্ষুব্ধ স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন যে, ইতি রাণীকে হত্যার আগে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং শিশুরা বিষয়টি প্রত্যক্ষ করায় তাদেরও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশ শুরুতে মামলা নিতে গড়িমসি করেছে এবং সাধারণ একটি জিডি রেকর্ড করার মাধ্যমে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মতে, ডাকবাংলোর মতো একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বাইরের কেউ প্রবেশ করে এই ধরনের নৃশংসতা ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা বড় ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়, যা তদন্তের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কেবল তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বরগুনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তের নির্দেশ দিলেও পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং বর্তমানে অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে পুলিশি এই মন্থর গতি এবং মামলা দপ্তরিকভাবে রেকর্ড করার প্রক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা মনে করছেন, প্রভাবশালী কোনো চক্র বা ডাকবাংলোর সাথে সংশ্লিষ্ট কারো যোগসাজশ ছাড়া এমন ঘটনা ঘটানো অসম্ভব। প্রশাসন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনকে আটক করতে পারেনি, যা তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ডাকবাংলোর সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের কল রেকর্ড যাচাই-বাছাই করে দ্রুত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
এই লোমহর্ষক ঘটনাটি বরগুনার জননিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডাকবাংলোর মতো সরকারি স্থাপনায় মা ও দুই শিশুর মৃত্যুর এই ঘটনা প্রশাসনিক গাফিলতি ও সুরক্ষার অভাবকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। যদি এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার না হয় এবং প্রকৃত দোষীরা শনাক্ত না হয়, তবে জনমনে প্রশাসনের প্রতি আস্থার চরম সংকট তৈরি হবে। একদিকে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ, অন্যদিকে পুলিশের দায়সারা তদন্ত প্রক্রিয়া বিষয়টি জটিল করে তুলেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচারের কোনো বিকল্প নেই। এখন দেখার বিষয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কত দ্রুত এই রহস্য উন্মোচন করতে পারে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ন্যায়বিচার প্রদান করতে সক্ষম হয় কি না।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News