বরগুনা-বরিশাল: বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত সাতজন আহত হওয়ার ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে বরগুনা-বাকেরগঞ্জ-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের নিরাপত্তা সংকট। দীর্ঘদিন ধরে সরু সড়ক, একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক এবং ভারী যানবাহনের চাপের কারণে মহাসড়কটি কার্যত দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গত শনিবার (৪ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা বরগুনার পাথরঘাটাগামী "আলিফ পরিবহন" নামের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা ঢাকাগামী একটি মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে বাসের পাঁচ যাত্রী, ট্রাকের চালক ও হেলপারসহ অন্তত সাতজন আহত হন। সংঘর্ষে বাস ও ট্রাকের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। খবর পেয়ে গৌরনদী ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রাক জব্দ করেছে পুলিশ। গৌরনদী হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোহসীন বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করা হচ্ছে।
৫১ বাঁকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি: দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বরগুনা-বাকেরগঞ্জ-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ কিলোমিটার হলেও এর প্রস্থ মাত্র ১৮ ফুট। সড়কজুড়ে রয়েছে ৪৫ থেকে ৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৩০০টি যাত্রীবাহী বাস ছাড়াও শত শত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। বিশেষ করে পায়রা সেতুতে ওজন সীমাবদ্ধতা থাকায় ৩০ টনের বেশি ভারী ট্রাক বিকল্প হিসেবে এই সড়ক ব্যবহার করছে। ফলে সড়কের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ওয়েইব্রিজ না থাকায় নিয়ন্ত্রণহীন ভারী যান:
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৮টি ওজন পরিমাপক (ওয়েইব্রিজ) স্টেশন থাকলেও বরগুনায় এখনো একটি ওয়েইব্রিজ স্থাপন করা হয়নি। ফলে অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহনের ওজন নিয়ন্ত্রণ কার্যত সম্ভব হচ্ছে না। এতে সড়কের অবকাঠামো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বরগুনা-বরিশাল রুটের বাসচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, বরগুনা থেকে বরিশাল যেতে প্রায় ৫১টি বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম করতে হয়। সরু সড়কে বিপরীত দিক থেকে বড় যানবাহন এলে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দ্রুত বরগুনায় একটি ওয়েইব্রিজ স্থাপন এবং মহাসড়ক প্রশস্ত করা জরুরি।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বরগুনার অর্থনীতি ও পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য চার লেনের আধুনিক মহাসড়ক এখন সময়ের দাবি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কটির প্রশস্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সরলীকরণ এবং চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলমান রয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সড়কটির বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় প্রশস্তকরণ ও বাঁক সরলীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রকল্প অনুমোদন হলে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু হবে।
স্থানীয়দের মতে, বরগুনা-বাকেরগঞ্জ-বরিশাল মহাসড়ক দ্রুত চার লেনে উন্নীত করা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক অপসারণ, প্রয়োজনীয় স্থানে ওয়েইব্রিজ স্থাপন এবং সড়কের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে দুর্ঘটনা ও দুর্ভোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হবে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News