-আতঙ্কে কাটছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ-
সাইফ সোহেল ।। বিশেষ প্রতিনিধি: মহাস্রোতা বিষখালী নদীর অব্যাহত ও তীব্র ভাঙনে মানচিত্র থেকে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে বরগুনার উপকূলীয় বামনা উপজেলা। নদীর প্রবল পরাক্রম আর ভাঙনঝুঁকির পাশাপাশি জেলার ৬টি উপজেলার ২৪টি পয়েন্টে প্রায় আড়াই কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই অঞ্চলের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। ভাঙন রোধে সাময়িক জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হলেও স্থায়ী সমাধানের অভাবে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে। বামনা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ইতোমধ্যে বিষখালীর পেটে চলে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে—গাজীপুর, বামনা, চেচান, বেবাজিয়াখালী, কলাগাছিয়া, পশ্চিম সফিপুর, রুহিতা, অযোধ্যা, পোটকাখালী, উত্তর রামনা, দক্ষিণ রামনা, চলাভাঙ্গা ও দক্ষিণ কাকচিড়া। কোথাও গ্রামের এক-তৃতীয়াংশ, আবার কোথাও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নদী গ্রাস করেছে। নদীর তীরবর্তী সড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দেওয়ায় এবং মাটি ধসে যাওয়ায় বামনার সঙ্গে বরগুনা জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ যেকোনো মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রামনা এলাকার প্রধান সড়কটি নদীগর্ভে বিলীনের পথে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, রামনা পুরাতন লঞ্চঘাট এলাকায় স্থায়ীভাবে সিসি ব্লক দিয়ে নদীশাসনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ মেলেনি। বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে নির্মিত জেলার ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ২২টি পোল্ডারের ২৪টি স্থানে প্রায় ২ কিলোমিটার ৫৭০ মিটার অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে- বরগুনা সদর উপজেলার ১০টি স্থানে ১,০২৫ মিটার, পাথরঘাটা উপজেলার ৪টি স্থানে ৫৮৫ মিটার, বামনা উপজেলার ৪টি স্থানে ৩৪০ মিটার, তালতলী উপজেলার ২টি স্থানে ৩১০ মিটার, বেতাগী উপজেলার ২টি স্থানে ১৯০ মিটার এবং আমতলী উপজেলার ২টি স্থানে ১২০ মিটার।
নদীর পানি সামান্য বৃদ্ধি পেলেই এসব দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সিডর ও মোখার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো উপকূলের সাধারণ মানুষ যেকোনো জলোচ্ছ্বাসের ভয়ে তটস্থ থাকেন। বেতাগী শহরের পশ্চিম পাশে বিষখালী নদীর পাড়ের বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ায় হাজারো ব্যবসায়ী বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কায় আছেন।
বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. নিকহাত আরা জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান জানান, দক্ষিণ রামনা এলাকাসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে বর্তমানে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। এছাড়া আমতলী, ঘটখালী, জাঙ্গালিয়া ও বেতাগী লঞ্চঘাট এলাকায় স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি রামনা খেয়াঘাট, কালমেঘা, কাকচিড়া ও ডালভাঙার ভাঙন রোধে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা দাখিল করা হয়েছে; যা বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের মানুষ নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের স্থায়ী সুরক্ষা পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News