নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা। বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের খোট্টার চর ও অংকুজানপাড়া এলাকায় স্থাপিত ৩৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন বঞ্চনার অভিযোগ, অন্যদিকে প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ও মালামাল চুরির অভিযোগ এলাকাজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হিসেবে ২০২৩ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বরিশাল ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিইপিসিএল), যা পাওয়ার চায়না এবং আইসোটেক গ্রুপ-এর যৌথ উদ্যোগে গঠিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কয়েকশ একর কৃষিজমি, বসতভিটা ও জলাশয় অধিগ্রহণ করা হলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায়নি। তাদের দাবি, ভূমি অধিগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে।স্থানীয় সূত্রের দাবি, উচ্ছেদের শিকার অন্তত ১৪২টি পরিবার এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। অনেক পরিবার তাদের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
নিশানবাড়িয়ার বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, “আমার প্রায় চার একর জমি প্রকল্পের জন্য নেওয়া হয়েছে। যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছি, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে সমপরিমাণ জমি কেনা সম্ভব নয়। আগে নিজের জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চলত, এখন দিনমজুরি করতে হয়।” রহিমা বেগম নামে এক ক্ষতিগ্রস্ত নারী জানান, স্বামীর রেখে যাওয়া জমিই ছিল পরিবারের একমাত্র সম্বল। জমি হারানোর পর সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ: প্রকল্প নির্মাণের সময় স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের আশ্বাস দেওয়া হলেও অধিকাংশ চাকরিতে বাইরের লোকজন নিয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষক সেলিম মৃধা বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা বেকার ঘুরছে। অথচ প্রকল্পে কাজ করছে অন্য এলাকার মানুষ। স্থানীয়দের জন্য যে সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছিল, তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি।”
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রমে স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় জেলে নুর ইসলাম বলেন, “আগে নদী ও খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। মাছ ধরেই সংসার চলত, কিন্তু এখন আয় কমে যাওয়ায় পরিবার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।”
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। এদিকে প্রকল্প এলাকায় মূল্যবান যন্ত্রাংশ, তামার তার, লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম চুরির অভিযোগও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে তালতলী এলাকায় কয়েক ডজন ভাঙারি দোকান গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকানের অনেকগুলোতেই প্রকল্প থেকে চুরি হওয়া মালামাল কেনাবেচা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, “রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। রাতের আঁধারে প্রকল্প এলাকা থেকে মালামাল বের করে ভাঙারি দোকানে বিক্রি করা হয়।”
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি অভিযোগকারীরা।
স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, চোরাই মালামাল উদ্ধারে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে লোহা, তামার তারসহ মূল্যবান সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, “চোরচক্রকে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।” বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং মালামাল চুরির ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম মনে করেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প দেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার নিশ্চিত না হলে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হয়। তিনি বলেন, “জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় প্রকল্প দরকার। কিন্তু স্থানীয় মানুষ যদি সেই উন্নয়নের সুফল না পায়, তাহলে ক্ষোভ তৈরি হবেই। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির সুষ্ঠু মূল্যায়ন জরুরি।”
স্থানীয়দের প্রধান দাবিগুলো সমূহ—
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা পুনঃযাচাই করা।
প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
পুনর্বাসন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা।
পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির স্বাধীন তদন্ত করা।
এবং প্রকল্পের মালামাল চুরি ও লুটপাটের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তালতলীর ৩৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমানে দ্বিমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে এটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, অন্যদিকে জমি হারানো মানুষদের বঞ্চনা, পুনর্বাসন সংকট, কর্মসংস্থান নিয়ে অসন্তোষ এবং মালামাল চুরির অভিযোগ প্রকল্পটির গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়ন ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News