নিজস্ব প্রতিবেদক, আমতলী (বরগুনা): বরগুনার আমতলী উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের একমাত্র প্রধান মহাশ্মশান দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সংকটে জর্জরিত। ভাঙাচোরা সংযোগ সড়ক, অসম্পূর্ণ সীমানাপ্রাচীর, নিচু জমিতে জলাবদ্ধতা, স্থায়ী শেডের অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অনুপস্থিতি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সমস্যার কারণে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া স্বজন ও সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যা বিদ্যমান থাকলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে শোকাহত পরিবারগুলোকে প্রতিকূল পরিবেশে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হচ্ছে, যা মানবিক ও ধর্মীয়—উভয় দিক থেকেই উদ্বেগজনক। আমতলী উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট হরিহর চন্দ্র দাস বলেন, শ্মশানঘাটে যাওয়ার একমাত্র সংযোগ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় কাদা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে মৃতদেহ নিয়ে শ্মশানঘাটে পৌঁছাতে স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক সময় যানবাহন প্রবেশ করতে না পারায় মরদেহ কাঁধে বহন করতে হয়। আমতলী হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অশোক মজুমদার বলেন, শ্মশানঘাটের চারপাশে পূর্ণাঙ্গ সীমানাপ্রাচীর না থাকায় জমি বেদখলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশুর অবাধ বিচরণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নিচু এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে শ্মশানঘাটের বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। পর্যাপ্ত মাটি ভরাট ও ভূমি উন্নয়ন করা হলে সারা বছর নির্বিঘ্নে শ্মশানঘাট ব্যবহার করা সম্ভব হবে। আমতলী কালিবাড়ী ও মহাশ্মশানঘাট কমিটির সভাপতি সুবত চন্দ্র শীল বলেন, শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারী মানুষের জন্য স্থায়ী বর্ষা ও রোদ প্রতিরোধী শেডের অভাব বড় সমস্যা। বৃষ্টি কিংবা তীব্র রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে হয়। এছাড়া বসার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় নারী, শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন। তিনি বলেন, শ্মশানঘাটে বিশুদ্ধ পানির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা এবং নারী-পুরুষের জন্য পৃথক স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও নেই, ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে। আমতলী মহিলা কলেজের ইংরেজি প্রভাষক ও মানবাধিকার কর্মী বানী রানী সরকার বলেন, সন্ধ্যার পর পুরো শ্মশানঘাট এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক বাতি বা সড়কবাতি না থাকায় রাতে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অন্ধকারের সুযোগে অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগও রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়েছে। আমতলী মহাশ্মশান কমিটির সাবেক সভাপতি ঘোটন কুণ্ড বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে বিভিন্ন সময়ে নির্মাণসামগ্রী, লোহার সরঞ্জামসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির ঘটনা ঘটেছে। তিনি স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্থানীয়দের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও শ্মশানঘাটটি পিছিয়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত বৃক্ষ ও সবুজ বনায়নের অভাবে পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হলে পরিবেশের উন্নয়নের পাশাপাশি শ্মশানঘাটের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে। সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সচেতন নাগরিকরা বলেন, একটি শ্মশানঘাট শুধু শেষকৃত্যের স্থান নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক প্রতিষ্ঠান। তাই এখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—শ্মশানঘাটের সংযোগ সড়ক দ্রুত সংস্কার, পূর্ণাঙ্গ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন ও মাটি ভরাট, স্থায়ী বর্ষা ও রোদ প্রতিরোধী শেড নির্মাণ, দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সংস্থান, নারী-পুরুষের জন্য পৃথক স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং ধর্মবিষয়ক কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে মানবিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ বাস্তবায়িত হলে আমতলীর মহাশ্মশান একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও মর্যাদাপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে পরিণত হবে, যেখানে শোকাহত পরিবারগুলো সম্মানের সঙ্গে তাদের প্রিয়জনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারবেন।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News