তালতলী প্রতিনিধি: বরগুনার তালতলীতে জমির দলিল চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক নারীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করার অভিযোগে ভোলা জেলার এক এএসআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বরগুনার তালতলী উপজেলার গাবতলী এলাকায় জমির দলিল চাওয়াকে কেন্দ্র করে কহিনুর বেগম নামক এক নারীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে। গত শনিবার সংঘটিত এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগী কহিনুর বেগম বুধবার আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্ত খলিলুর রহমান বর্তমানে ভোলা জেলার তজুমদ্দিন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কর্মরত রয়েছেন। মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ও জমি সংক্রান্ত জটিলতার জের ধরে এই হামলার সূত্রপাত ঘটে। ভুক্তভোগীর প্রয়াত স্বামী ইসমাইল ঘরামী ৩৩ শতাংশ জমি ক্রয়ের জন্য হামেদ ঘরামীকে ৩০ হাজার টাকা প্রদান করেছিলেন, কিন্তু ২০১৩ সালে ইসমাইলের মৃত্যুর পরও সেই জমির দলিল হস্তান্তর করা হয়নি। বারবার স্থানীয় সালিশ বৈঠকেও কোনো কার্যকর সমাধান না মেলায় কহিনুর বেগম গত শনিবার সকালে পুনরায় দলিল দাবি করতে গেলে অভিযুক্ত এএসআই খলিলুর রহমান ও তার বাবা হামেদ ঘরামী ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর চড়াও হন।
ভুক্তভোগী কহিনুর বেগমের অভিযোগ অনুযায়ী, দলিল চাওয়ার অপরাধে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে। হামলায় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করার পাশাপাশি লোহার রড দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। ঘটনার পরপরই স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন, যেখানে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কহিনুর বেগম বলেন, আমার স্বামী জীবিত অবস্থায় জমির জন্য টাকা পরিশোধ করেছিলেন, কিন্তু আমাদের প্রাপ্য দলিল বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো আমার ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমি আইনের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় কর্মরত থাকার সুবাদে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে দলিল না দিয়ে জমি আত্মসাতের পাঁয়তারা করছেন। এই ঘটনাটি এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই খলিলুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে মামলার তদন্তের বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তালতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইদুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এদিকে, অভিযুক্ত এএসআইয়ের কর্মস্থল ভোলা জেলার পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহ কাওছার জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রশাসনিকভাবে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
একজন আইন রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠায় জনমনে চরম অসন্তোষ ও ভীতির সঞ্চার হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের দ্বারাই যখন নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা সংকটের মুখে পড়ে। এই ঘটনাটি কেবল জমি সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ক্ষমতার অপপ্রয়োগের একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যান কি না, তা এখন দেখার বিষয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে দ্রুততম সময়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News