সাংবাদিক ও লেখক - এ্যাডভোকেট সাইফ সোহেল: দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বরগুনা জেলা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। পায়রা ও তালতলীর কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে, যা আলোকিত করছে দেশের দূর-দূরান্তের বিভিন্ন অঞ্চল। কিন্তু এক নির্মম বৈপরীত্যের মুখোমুখি এই অঞ্চলের প্রায় ১২ লাখ মানুষ। চরম পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি বহন করেও বরগুনাবাসী তাদের মৌলিক ও ন্যায্য বিদ্যুৎ অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
স্থানীয় প্রবাদ 'প্রদীপের নিচেই অন্ধকার'—যেন বরগুনার বাস্তবতার সাথে হুবহু মিলে যায়। সম্প্রতি বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির ব্যানারে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহসহ ৭ দফা দাবিতে ওজোপাডিকোর বরগুনা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ঘেরাও ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বার্তা পরিষ্কার—এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি আসবে। এই আন্দোলন স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, স্থানীয় বিদ্যুৎ সংকট এখন চরম অস্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওজোপাডিকোর তথ্যমতে, বর্তমানে বরগুনা শহরে ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩.৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশের কাছাকাছি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা পল্লী বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ (৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে মাত্র ৩.৫-৪ মেগাওয়াট)। বিদ্যুৎ ঘাটতির এই ধ্বংসাত্মক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলীয় জেলার সার্বিক অর্থনীতিতে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণকেন্দ্র পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে বিদ্যুৎ সংকটে বরফ উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আহরিত মাছ পচে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে হাজারো জেলে ও ব্যবসায়ী মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতি চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। জাতীয় বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে শুধু আশ্বাস নয়, টেকসই নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। পায়রা ও তালতলী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ স্থানীয় গ্রিডে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। পুরোনো ও জরাজীর্ণ ট্রান্সফরমার ও লাইন পরিবর্তন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং সিস্টেম লস শূন্যে নামিয়ে আনা জরুরি। সঠিক বিলিং নিশ্চিত করা, ডিমান্ড চার্জ পুনর্বিবেচনা এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে স্বচ্ছতার আওতায় আনা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান কেবল সরকারি নীতির ওপর নির্ভর করে না; নাগরিক পর্যায় থেকেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বা অপ্রয়োজনে বৈদ্যুতিক বাতি, সিলিং ফ্যান, এসি ও মাল্টিপ্লাগ বন্ধ রাখার অভ্যাস করতে হবে। বিশেষ করে কক্ষ ফাঁকা থাকা অবস্থায় ফ্যান বা লাইট জ্বালিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকা জরুরি। এসির তাপমাত্রা সবসময় ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার উপরে সেট করা উচিত। এছাড়া এসির ব্যবহার কমিয়ে ফ্যানের নিয়মিত ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া এবং নিয়মিত এসির ফিল্টার পরিষ্কার রাখা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অত্যন্ত কার্যকরী। কাপড় ইস্ত্রি করার সময় একসাথে অনেকগুলো কাপড় একসঙ্গে ইস্ত্রি করা এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ও ওভেন বা রাইস কুকার ব্যবহার সীমিত করা উচিত। পুরনো এবং কম মানের বাল্বের পরিবর্তে শক্তি সাশ্রয়ী এলইডি (LED) বা এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। এছাড়া টিউবলাইটে পুরোনো চৌম্বকীয় ব্যালেস্টের পরিবর্তে আধুনিক ইলেকট্রনিক ব্যালেস্ট ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ খরচ অনেক কমে যায়। শপিংমল, অফিস-আদালত এবং বিভিন্ন বিপণন কেন্দ্রে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বা অতিরিক্ত বাতি জ্বালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের পর এসি ও সাইনবোর্ডের আলো বন্ধ রাখা নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে বা ধর্মীয় উৎসবে অতিরিক্ত রঙিন বাতি ও আলোকসজ্জার ব্যবহার পরিহার করতে হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক খাতে অতিরিক্ত চাপের কারণে সন্ধ্যায় 'পিক-আওয়ারে' বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। নাগরিক পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার ১০-১৫% কমিয়ে আনা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিড থেকে কয়েকশ মেগাওয়াটের চাপ হ্রাস পাবে, যা বরগুনার মতো সংকটপূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। বরগুনাবাসীর ৭ দফা দাবি কেবল একটি অঞ্চলের আন্দোলন নয়, এটি মৌলিক অধিকার আদায়ের এক অহিংস ও যৌক্তিক প্রকাশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী অঞ্চলের মানুষকে অন্ধকারে রেখে জাতীয় উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। সরকারের দ্রুত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ এবং সাধারণ জনগণের সচেতনতাই পারে বরগুনাকে এই অন্ধকার অচলাবস্থা থেকে মুক্ত করতে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News