পর্যটন সম্ভাবনাময় উপকূলীয় জেলা বরগুনায় সরকারি উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে ‘সুরঞ্জনা ইকো-টুরিজম এন্ড রিসোর্ট’, যা স্থানীয় পরিবেশ ও পর্যটনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ উপকূলীয় জেলা বরগুনা দীর্ঘ সময় ধরে পর্যটন মানচিত্রে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল। বিষখালী, বলেশ্বর, বুড়িশ্বর ও আন্ধারমানিক নদীর মোহনায় অবস্থিত এ জেলাটি সুন্দরবন ও কুয়াকাটার ভৌগোলিক সান্নিধ্যে থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে পর্যটন শিল্প হিসেবে বিকশিত হতে পারেনি। এই অচলাবস্থা নিরসনে বরগুনার স্থানীয় লেখক ও সাংবাদিক সোহেল হাফিজ নিজস্ব অর্থায়ন ও সাহসী পরিকল্পনায় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন ‘সুরঞ্জনা ইকো-টুরিজম এন্ড রিসোর্ট’। বরগুনা শহর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে খাকদোন ও বিষখালী নদীর কোলঘেঁষে ঢলুয়া ইউনিয়নের বড়ইতলা ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এই রিসোর্টটি বর্তমানে স্থানীয় ও দূরবর্তী পর্যটকদের জন্য প্রকৃতির এক নিভৃত অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। গোলপাতা, নলখাগড়া ও কাশবন দিয়ে সাজানো এই কেন্দ্রে ৫০ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বৃক্ষ রোপণের পাশাপাশি পাখিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ অভয়াশ্রম, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
রিসোর্টটি পরিদর্শনে আসা পর্যটকদের ভাষ্যমতে, এটি কেবল বিনোদনের স্থান নয়, বরং যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে মুক্তির এক আধার। পর্যটক আবদুল্লাহ আল নাইম ও সালেহ মাহমুদ সুমনের মতো দর্শনার্থীরা জানান, এখানে ফলজ বৃক্ষ ও জলাশয়ের সমন্বয়ে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে, যা ভ্রমণপিপাসুদের এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়। স্থানীয় শিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেন, শহরের খুব কাছে এমন মনোরম ও পরিকল্পিত পরিবেশ পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে পর্যটন উদ্যোক্তা ও পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমানের মতে, বরগুনার লালদিয়ারচর, হরিণঘাটা কিংবা শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতের মতো সম্পদগুলো এখনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি। ব্যক্তি উদ্যোগের এই সফলতাকে পুঁজি করে সরকারিভাবে বৃহত্তর পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, পরিকল্পিত অবকাঠামো ও প্রচারণার অভাবে জেলার অপার সম্ভাবনাগুলো এখনো আড়ালে রয়ে গেছে।
রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল হাফিজ জানান, বরগুনায় বিনোদনের অভাব এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে উদ্যোক্তার অভাবেই তিনি এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় হাত দিয়েছেন। তার এই উদ্যোগে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ শুরু থেকেই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। অন্যদিকে, সরকারিভাবেও পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ আজিজ জানান, সুরঞ্জনা ইকো-টুরিজম সেন্টারটি বর্তমান সময়ের জন্য একটি চমৎকার মডেল। তিনি উল্লেখ করেন, বন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে গোড়াপদ্মার মতো এলাকাগুলোকে পরিকল্পিত পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। অনাপত্তি পাওয়া সাপেক্ষে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় আধুনিক ট্রেইল ও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পরিশেষে, বরগুনার পর্যটন শিল্পের এই নবজাগরণ কেবল একটি রিসোর্টের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকলে চলবে না। সুরঞ্জনা ইকো-টুরিজম এন্ড রিসোর্ট প্রমাণ করেছে যে, যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে উপকূলীয় এই জনপদ দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে পারে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বরগুনা অদূর ভবিষ্যতে পর্যটন অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এটি কেবল স্থানীয় কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করবে না, বরং উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও একটি টেকসই মডেল হিসেবে কাজ করবে, যা পর্যটন খাতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News