বরগুনা সদর উপজেলা প্রতিনিধি: বরগুনা সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের ভাঙন এখন আর সম্ভাব্য ঝুঁকি নয়, বরং চলমান বাস্তবতা। গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনের জোয়ারের পানিতে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। লবণাক্ত পানি বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও পুকুরে প্রবেশ করায় জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার না করায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নলটোনা ইউনিয়নের প্রায় ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত নাজুক এবং প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধ কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। কোথাও বাঁধ ধসে গেছে, কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় ফাটল। ফলে প্রতিটি জোয়ারের সময় লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। পাশাপাশি মাছের ঘের, পুকুর ও বসতবাড়িও হুমকির মুখে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষ চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, "প্রতিদিন জোয়ারের পানি বাড়িঘর ও জমিতে ঢুকছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে, চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যাবে।"
মোছা. হেলেনা বেগম বলেন, "জোয়ারের সময় ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি চলে আসে। সন্তানদের নিয়ে সব সময় ভয়ে থাকি। আমাদের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই।"
ভুক্তভোগী মো. পনু খোন্দকার বলেন, "আমাদের একমাত্র অবলম্বন কৃষি। কিন্তু লবণাক্ত পানিতে জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা পথে বসব।"
মো. সোনামিয়া বলেন, "বয়সের এই পর্যায়ে এমন দুর্ভোগ আর কখনো দেখিনি। প্রতিদিনই বাঁধ ভাঙছে, পানি বাড়ছে। আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।"
মো. বেল্লাল খোন্দকার বলেন, "শুধু অস্থায়ী মেরামত নয়, স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তা না হলে প্রতি জোয়ারেই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"
নলটোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাবেক নেতা এ কে এম সফিকুজ্জামান মাহফুজ বলেন, "নলটোনা ইউনিয়নের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রতিদিন নদীভাঙন ও জোয়ারের পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।"
তিনি আরও বলেন, "স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে ব্লক প্রটেকশন (কংক্রিট ব্লক স্থাপন) অত্যন্ত জরুরি। ব্লক প্রটেকশন ছাড়া এই নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।"
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, "ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রয়েছে। প্রয়োজনীয় মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ পেলে স্থায়ী সংস্কারকাজও বাস্তবায়ন করা হবে।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর একই সংকট দেখা দিলেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের প্রভাব ও জোয়ারের তীব্রতা বাড়তে থাকায় নলটোনার মতো উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ব্লক প্রটেকশন এবং নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। এ অবস্থায় নলটোনা ইউনিয়নের মানুষের একটাই দাবি—জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ব্লক প্রটেকশনের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ এবং তাদের জীবন, জীবিকা ও বসতভিটা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News