জাহাঙ্গীর কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : বরগুনার আদালতে ভুয়া ট্রেজারি চালান জমা দিয়ে এক আসামির জামিন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতি ও আদালতপাড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর চালানটি আদালতে সত্যায়িত করে জমা দেওয়া আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. গোলাম মোস্তফা সুমন আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে আবেদন করেছেন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত আসামির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ জানিয়েছেন। আদালত ও মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বরগুনা শহরের শহীদ স্মৃতি সড়কের বাসিন্দা মো. শাহজালাল বিল্লাহর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার নেন মো. মাহবুবুল আলম। পরে টাকা পরিশোধের জন্য ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল ইসলামী ব্যাংক বরগুনা শাখার একটি ১০ লাখ টাকার চেক দিলেও হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেকটি অসম্মানিত হয়। এ ঘটনায় ২০২৩ সালের ৭ জুলাই বরগুনার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন শাহজালাল বিল্লাহ। মামলার রায়ে ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বরগুনার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালত আসামিকে বাদীকে ১০ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই আদেশের পর আসামি মাহবুবুল আলম ৫ লাখ টাকা আদালতে জমা দেওয়ার দাবি করে একটি চালানের কপি দাখিল করেন, যা আইনজীবীর সত্যায়িত ছিল। ওই চালানের ভিত্তিতেই তিনি আপিল ও জামিন লাভ করেন।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল বরগুনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত আপিল খারিজ করে পূর্বের ছয় মাসের সাজা বহাল রাখেন এবং বাদীকে ১০ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া বলে দাবি করা ৫ লাখ টাকা উত্তোলনেরও আদেশ দেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী বাদী শাহজালাল বিল্লাহ বরগুনা হিসাবরক্ষণ অফিস ও সোনালী ব্যাংকে টাকা তুলতে গেলে জানতে পারেন, আদালতে জমা দেওয়া ৫ লাখ টাকার চালানটি ভুয়া। পরে গত ১২ জুলাই তিনি বিষয়টি লিখিতভাবে আদালতকে অবহিত করেন। আদালত এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ২২ জুলাই দিন ধার্য করেছেন।
এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. গোলাম মোস্তফা সুমন গত ৯ জুলাই আদালতে দেওয়া আবেদনে জানান, আসামির দেওয়া চালানের সত্যতা যাচাই না করেই তিনি সেটি সত্যায়িত করেছিলেন। তিনি এ ঘটনায় আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আসামির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আসামি মাহবুবুল আলম পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার কিসমতপুর দেলোয়ার হোসেন ডিগ্রি কলেজের একজন প্রভাষক। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার মাহবুবুল আলমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মামলার বাদী শাহজালাল বিল্লাহ বলেন, "ভুয়া চালান দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা উচিত।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, আদালতে কোনো নথি সত্যায়িত করার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এমন ঘটনায় দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির আহ্বায়ক ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. নুরুল আমিন বলেন, "সাধারণত সহকারীদের মাধ্যমে আসা চালান বিশ্বাসের ভিত্তিতে সত্যায়িত করা হয়। তবে এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভবিষ্যতে ব্যাংকের মাধ্যমে চালানের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে কোনো চালান আদালতে দাখিল না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।"
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News