নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা: বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী দুর্যোগপ্রবণ জেলা বরগুনা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এখানকার মানুষ। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্পান, ২০২২ সালের সিত্রাং এবং ২০২৩ সালের মোখার মতো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনও উপকূলবাসীর মনে দাগ কাটে। তবে বড় দুর্যোগের আগে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে প্রয়োজনের তুলনায় সাইক্লোন শেল্টারের অপ্রতুলতা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ জনসংখ্যার বরগুনা জেলায় সরকারি হিসেবে স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টারের সংখ্যা ৪৭২টি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে জেলার মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। দুর্যোগের সময় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন বহুতল ভবনকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ৬০০-এর বেশি করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনা উপজেলার উপকূলীয় ইউনিয়নগুলো। বিশেষ করে এম. বালিয়াতলী, বুড়িরচর, নলটোনা, ঢলুয়া, কুকুয়া, নিশানবাড়িয়া, চরদুয়ানী, ছোটবগী, বড়বগী ও কাকচিড়া ইউনিয়নের অনেক বাসিন্দাকে দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সাইক্লোন শেল্টার দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই, কোথাও টয়লেট অপ্রতুল। নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাও অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে নেই। এছাড়া অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সড়ক বেহাল থাকায় দুর্যোগের সময় সেখানে পৌঁছানোও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
বরগুনা সদর উপজেলার ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)-এর টিম লিডার জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, "বরগুনা একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জেলা। বর্তমানে যে সংখ্যক সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে, তা সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নয়। নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেখানে সহজে পৌঁছানোর জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।"
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, "উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ এবং নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।"
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে। সে অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সড়কগুলো সারাবছর চলাচল উপযোগী রাখতে হবে।"
পাথরঘাটার জেলে মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "সতর্ক সংকেত পেলেই পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। কিন্তু অনেক সময় জায়গার সংকট দেখা দেয়। আবার দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে গিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়।"
তালতলীর নিশানবাড়িয়া গ্রামের গৃহিণী মোরশেদা আক্তার বলেন, "দুর্যোগের সময় শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা খুব কষ্টকর। অনেক জায়গায় নারীদের জন্য আলাদা ও নিরাপদ ব্যবস্থা নেই।"
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার পর্যায়ক্রমে নতুন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ এবং পুরোনো আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উপকূলীয় এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ঘূর্ণিঝড়ের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি বিবেচনায় আরও বড় পরিসরের পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, শুধু নতুন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করলেই হবে না; আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নিরাপদ সড়ক, কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা, পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
উপকূলের মানুষের একটাই প্রশ্ন—পরবর্তী ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই কি নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা মিলবে, নাকি আবারও হাজারো মানুষ জীবন হাতে নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হবে?
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News