বরগুনা জেলা সংবাদদাতা: বরগুনা সদর উপজেলার ধূপতি মনসাতলী এলাকার সামাজিক বনায়নের গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম, ভুয়া মেজারমেন্ট এবং পরিকল্পিতভাবে গাছের পরিমাণ কম দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় উপকারভোগী, জমির মালিক এবং এলাকাবাসীর দাবি, বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, বনায়ন সমিতির নেতৃবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার চক্রের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ কাঠ গোপনে লোপাট করা হয়েছে। এতে সরকার যেমন বড় অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে, তেমনি বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত উপকারভোগীরাও।
জানা যায়, বরগুনা জেলার খাকধোন নদীর উত্তর পাড় ঘেঁষে মনসাতলী এলাকায় সুধাংশুর বাড়ি থেকে হোসেন শরীফের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রায় চার হাজার ৮০০টি চারা রোপণ করা হয়। রেন্ট্রি, মেহগনি, শিশু, চাম্বল, অর্জুন, আকাশমনি, কড়ই, করমজা, খইয়াবাবলা, পিটালি, জাম, খয়ের ও জারুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিয়ে গড়ে ওঠে এই বাগান। বনায়নের সুবিধাভোগী হিসেবে স্থানীয় ৩২ জনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার সভাপতি মো. আব্দুল আজিজ খান।
বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সৃজিত বাগান থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ বণ্টন বিভিন্ন চুক্তির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। প্রচলিত সরকারি বিধিমালা (যেমন: সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০৪) অনুযায়ী লভ্যাংশ বণ্টনের সাধারণ হার নিচে দেওয়া হলো:
উপকারভোগী (অংশগ্রহণকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠী): ৪৫% থেকে ৬৫% পর্যন্ত। সাধারণত রাস্তার ধারের বা স্ট্রিপ বাগানের ক্ষেত্রে উপকারভোগীরা লভ্যাংশের ৬৫% পেয়ে থাকেন।
বন বিভাগ (সরকার): ১০% থেকে ২০%। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ১০% থেকে ১৫% হয়ে থাকে যা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
ভূমি মালিক সংস্থা (যদি বন বিভাগের নিজস্ব জমি না হয়): ১০%। যেমন—সড়ক ও জনপথ বিভাগ বা এলজিইডি-র রাস্তার পাশে বাগান হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ১০% পায়।
ইউনিয়ন পরিষদ: ৫%। স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির জন্য ইউনিয়ন পরিষদকে ৫% লভ্যাংশ দেওয়া হয়।
এনজিও (যদি জড়িত থাকে): এনজিও-র মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে চুক্তিভেদে তারা ১০% পর্যন্ত পেতে পারে, সেক্ষেত্রে উপকারভোগীদের হার সামান্য কমতে পারে।
পুনঃবনায়ন তহবিল (TFF): সাধারণত ১০% লভ্যাংশ একটি আলাদা স্থায়ী তহবিলে জমা রাখা হয় যাতে পরবর্তীতে একই স্থানে পুনরায় বাগান সৃজন করা যায়।
এটি একটি সাধারণ কাঠামো। নির্দিষ্ট প্রকল্পের ধরণ (যেমন: উডলট বাগান, কৃষি বনায়ন বা স্ট্রিপ প্ল্যান্টেশন) অনুযায়ী এই হার সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। আপনার এলাকার নির্দিষ্ট চুক্তি বা বন অধিদপ্তরের স্থানীয় কার্যালয় থেকে সঠিক হারটি যাচাই করে নিতে পারেন।
আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট রাস্তার ধারের বাগান বা বন বিভাগের নিজস্ব জমির বাগান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন? চট করে জানালে আমি আরও নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারব।
সামাজিক বনায়ন নীতিমালা অনুযায়ী এসব গাছ বিক্রির অর্থের ৬৫ শতাংশ উপকারভোগীরা পাওয়ার কথা, ১০ শতাংশ স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণকারী এনজিও, ১০ শতাংশ সরকারি রাজস্ব বিভাগ এবং ৫ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের তহবিলে জমা হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু টেন্ডার প্রক্রিয়া ঘিরে ওঠা অভিযোগে স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রকৃত হিসাব গোপন করে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাত করেছে সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগের প্রস্তুত করা টেন্ডার সিডিউল অনুযায়ী বিক্রিযোগ্য গাছের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪৬৭টি, যার মোট কাঠের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩০৫৫ দশমিক ২৯ ঘনফুট। এছাড়া জ্বালানি কাঠ হিসেবে বিক্রিযোগ্য দেখানো হয়েছে আরও প্রায় ১৪৬৯ ঘনফুট। তবে এলাকাবাসীর দাবি, তিন কিলোমিটার এলাকায় বাস্তবে গাছের সংখ্যা সিডিউলে দেখানো সংখ্যার তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ মেজারমেন্ট করার সময় অনেক গাছের ঘনফুট উদ্দেশ্যমূলকভাবে কম দেখানো হয়েছে। প্রতিটি গাছে গড়ে ১০ থেকে ১২ সিএফটি পর্যন্ত কাঠ কম দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে সহস্রাধিক সিএফটি কাঠ কম দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব এবং উপকারভোগীসহ স্টেকহোল্ডারদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, ৩৭৯ থেকে ৪০৩ নম্বর পর্যন্ত মোট ২৪টি মেহগনি গাছ পরিমাপ করা হলেও সেগুলো কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই অপসারণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই গাছগুলো জনৈক মামুন খান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কীভাবে এবং কার নির্দেশে এসব গাছ অপসারণ করা হয়েছে সে বিষয়ে বনায়ন কমিটির সদস্যরাও স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
অভিযোগ রয়েছে, মেজারমেন্টের সময় স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগতভাবে রোপণ করা কিছু গাছেও নম্বর দিয়ে সেগুলোকে বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের আওতায় দেখানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে নিজেদের গাছ বন বিভাগের তালিকা থেকে বাদ দিতে পেরেছেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। যেসব গাছের মালিকরা অর্থ দিতে পারেননি, তাদের গাছ টেন্ডারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগে কর্মরত দুই একজন কর্মকর্তা কর্মচারীর স্বজনরা এই টেন্ডার কাজে অংশগ্রহণ করে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। জমির প্রকৃত মালিকদের গাছ টেন্ডারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মালিকপক্ষ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদও সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার প্রতিবাদে বনায়ন কমিটির সদস্যদের পক্ষ থেকে পূর্ব ধূপতির বাসিন্দা মো. শানু খা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন প্রকার প্রতিকার পাননি। অভিযোগে টেন্ডার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে গাছের প্রকৃত মেজারমেন্ট পুনরায় যাচাই, টেন্ডার ছাড়াই অপসারণ করা ২৪টি মেহগনি গাছের বিষয়ে তদন্ত এবং পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং উপকারভোগীদের বঞ্চিত করার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও আবেদন করা হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, সামাজিক বনায়নের এই গাছগুলো স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রম ও অংশীদারিত্বের ফল। তাই কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ গাছগুলো বিক্রি করায় শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতিই নয়, বরং স্টেকহোল্ডারদের প্রতি বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বরগুনা বন বিভাগের রেঞ্জ সহকারী মো. হাসান জানান, 'সরকারি নিয়ম অনুযায়ীই গাছ বিক্রির জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়নি।' তার দাবি, স্থানীয় একটি মহল টেন্ডার প্রক্রিয়া বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি বন বিভাগের রেঞ্জ সহকারী পরিচয়ধারী মো. হাসানই এই দুর্নীতি ও লুটপাটের মূল পরিকল্পনাকারী।
বিষয়টি নিয়ে বরগুনা-পটুয়াখালী অঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক নুরুন্নাহারের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানীয়দের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তারা দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News