নিজস্ব প্রতিবেদক: বরগুনার পাথরঘাটায় আদালতের নির্দেশে করা মামলার বাদী ফাতিমা জোমাদ্দার অর্পাকে মারধর ও অবরুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে প্রধান আসামির বিরুদ্ধে, পাশাপাশি পাথরঘাটা থানার ওসির বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ!
বরগুনার পাথরঘাটায় আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও একটি মামলার বাদী ফাতিমা জোমাদ্দার অর্পার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। গত ১৮ জুন দুপুরে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী এলাকা থেকে পাথরঘাটা থানায় আসার পথে মামলার প্রধান আসামি বাদশা আকন ও তার সহযোগীরা অর্পাকে পথরোধ করে মারধর করে এবং একটি ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে পুলিশের হস্তক্ষেপে তিনি উদ্ধার হলেও এই ঘটনাটি প্রশাসনিক অবহেলা ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার একটি জঘন্য উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। তাৎক্ষণিক দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় ভিডিওটি- গত ২০ মে বরগুনার এসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল পাথরঘাটা থানা কর্তৃপক্ষকে মামলাটি এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিলেও, স্থানীয় থানা প্রশাসনের রহস্যজনক গড়িমসি এবং আসামিদের প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে বাদীকে বারবার নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার ভয়াবহতা এখানেই যে, মামলার প্রধান আসামিকে গত বুধবার রাতে পুলিশ আটক করার খবর পাওয়া গেলেও রহস্যজনক কারণে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তার পরদিনই বাদী হামলার শিকার হন ভূক্তভূগী! যা বর্তমান বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা অবনতির কারণে পুলিশের কার্যকারিতার ওপর জনমনে চরম আস্থার সংকট তৈরি করছে!!
ভুক্তভোগী ফাতিমা জোমাদ্দার অর্পার অভিযোগ অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশনা নিয়ে থানায় পৌঁছানোর পর ওসি মোহাম্মদ এনাম তাকে সহযোগিতার পরিবর্তে অশালীন ও অপমানজনক ভাষায় সম্বোধন করেন। অর্পা দাবি করেছেন, ওসি তাকে ‘আপনি সেই মাল? ইবলিস যেন কোথাকার’ বলে কটূক্তি করেন, যা একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে কোনোভাবেই কাম্য নয়। কল রেকর্ডটি ভাইরাল হওয়ার পরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করেন এ ব্যাপারে! ভুক্তভোগের সঙ্গে উপস্থিত থাকা উপজেলা বিএনপির নেত্রী ও সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মরিয়ম চৌধুরী জেবু ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ওসির এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে উপস্থিত সকলেই বিব্রত হয়েছিলেন। কেবল শারীরিক নির্যাতন বা আইনি সহায়তা প্রদানে গড়িমসিই নয়, বরং ওসির ব্যক্তিগত ও সরকারি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি মামলার বিষয়ে কথা না বলে উল্টো বাদীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টা করেন। অর্পার কাছে ওসির এমন অসহযোগিতামূলক আচরণের অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে, যা পুলিশি সেবার মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করছে। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, সঠিক সময়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলে এবং আসামিকে ছেড়ে না দিলে হয়তো তাকে এমন পাশবিক হামলার শিকার হতে হতো না।
ঘটনার বিষয়ে পাথরঘাটা থানার ওসি মোহাম্মদ এনামের সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, যা তার দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার অভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। অন্যদিকে, বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পাথরঘাটা সার্কেল) মোহাম্মদ শাহেদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, ওসির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ওসির বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ এর আগেও শোনা গেছে, যা প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে পুলিশের এই শৈথিল্য এবং বাদীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের জন্য চরম উদ্বেগজনক। প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে ওসির ভূমিকা তদন্ত করে দেখা এবং কেন আদালতের আদেশ কার্যকর করতে দীর্ঘসূত্রতা ও অবহেলা করা হয়েছে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, অন্যথায় আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা দ্রুতই তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।
পাথরঘাটার এই ঘটনাটি কেবল একটি একক অপরাধের চিত্র নয়, বরং এটি প্রান্তিক পর্যায়ে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানির একটি সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও যদি একজন বাদীকে এভাবে আসামিদের দ্বারা হামলার শিকার হতে হয় এবং পুলিশের কাছ থেকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, তবে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী, কারণ অপরাধীরা পুলিশের এমন নমনীয়তায় উৎসাহিত হয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে। নারী বাদীর ওপর এই হামলার দায়ভার কেবল অভিযুক্ত আসামির নয়, বরং যথাযথ সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়া সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদেরও নিতে হবে। অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি, যাতে করে ভবিষ্যতে কোনো ভুক্তভোগীকে থানায় গিয়ে অপমানিত হতে না হয় এবং আদালতের নির্দেশনার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News