ঢাকা প্রতিনিধি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে নিখোঁজ হওয়া বরগুনার এক স্কুলছাত্রীকে ঢাকার সাভার থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ, ঘটনায় জড়িত সমকামী চক্রের চার সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বরগুনা কলেক্টরেট স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মিথিলা আক্তার জুঁইয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীদের সাইবার ঝুঁকির এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে। গত ৮ জুন সকালে স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি ও পরবর্তীতে মামলা দায়ের করা হলে বরগুনা থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পুলিশ ঢাকার সাভার উপজেলার হেমায়েতপুর এলাকার একটি বাসা থেকে ওই স্কুলছাত্রীকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এই অপহরণ ও প্রলোভনের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার দায়ে সাথী আক্তার মারিয়া, আর্থি আক্তার ও জান্নাত আক্তার যতীসহ মোট চারজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক সম্পর্কের টানেই ভিকটিম স্বেচ্ছায় বা প্ররোচিত হয়ে ঘর ছেড়েছিল, যা অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, অভিযুক্তরা প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের একটি ‘গার্লস গ্রুপ’ নামক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়। এই ভার্চুয়াল সম্পর্কের গভীরতা এক পর্যায়ে সমকামী সম্পর্কে রূপ নেয়, যার জালে আটকা পড়ে ১৩ বছর বয়সী এই স্কুলছাত্রী। ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৬ ও ৭ জুন নাটোর এবং ধামরাই থেকে অভিযুক্তরা সাভারে সমবেত হয় এবং পরিকল্পিতভাবে একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে ৮ জুন সকালে বরগুনায় পৌঁছায়। স্কুলের সামনে থেকে ভিকটিমকে নিয়ে তারা পুনরায় সাভারে ফিরে যায় এবং আত্মগোপন করে। ভিকটিমের পরিবারের অভিযোগ, তাদের সন্তানের সরলতার সুযোগ নিয়ে একটি সংগঠিত চক্র তাকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক এই শিক্ষার্থীদের এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সামাজিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায় হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানীরা, যেখানে ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কোমলমতি শিশুদের জন্য স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঘটনার প্রেক্ষিতে বরগুনা থানা পুলিশ জানিয়েছে, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থেকে কম বয়সী মেয়েদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। আটককৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, উদ্ধারকৃত ভিকটিম মিথিলা আক্তার জুঁইকে আদালতের নির্দেশে বরিশাল সমাজসেবা অধিদপ্তরের জিম্মায় পাঠানো হয়েছে, যেখানে তাকে প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং ও পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দাবি, অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তারা বলছেন, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এই ধরনের সাইবার অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়, যদি না পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখে। এই ঘটনাটি কেবল একটি অপহরণের মামলা নয়, বরং এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও পারিবারিক নজরদারির ব্যর্থতার একটি সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। বরগুনার স্কুলছাত্রীর এই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি সারাদেশের অভিভাবকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার কীভাবে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে পারে, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট। এ ধরনের সমকামী চক্রের সক্রিয়তা এবং কিশোর-কিশোরীদের বিপথগামী হওয়ার প্রবণতা রোধে রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিক সমাজকে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঠেকাতে সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটকে আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News