অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: বরগুনা জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও নিয়োগ-সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বদলির ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দাবির পর প্রশাসনের এই পদক্ষেপে তারা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়াই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবে।
তালতলীর সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সমূহ ও বদলি প্রসঙ্গে: পূর্বের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে, যা শুধুমাত্র বরগুনা জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য ছিল, মুদ্রাক্ষরিক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে আবেদন করেন মো. সাইদুর রহমান।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি আবেদনপত্রে বরগুনা সদর উপজেলার ৫ নম্বর আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করলেও তার প্রকৃত স্থায়ী বাসস্থান পটুয়াখালী জেলায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত ঠিকানায় তার বা তার পরিবারের দীর্ঘদিনের বসবাসের তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়, নিয়োগের সময় স্থায়ী ঠিকানা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এছাড়া তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় উৎকোচ গ্রহণ, সেবা প্রদানে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি বরগুনা জেলা প্রশাসনের এক আদেশে তাকে তালতলী উপজেলা থেকে পাথরঘাটা উপজেলায় বদলি করা হয়েছে-
আমতলির চিন্ময় হাওলাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ সমূহ ও বদলি প্রসঙ্গে: আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সার্টিফিকেট সহকারী চিন্ময় হাওলাদারের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নিজের স্ত্রীকে একটি স্বতন্ত্র মাদ্রাসায় শিক্ষক পদে নিয়োগ পাইয়ে দেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলেও প্রতিশ্রুত কোনো সহায়তা তারা পাননি। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষিকা নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।
চিন্ময় হাওলাদার অভিযোগের বিষয়ে নিজের স্ত্রীকে চাকরি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। পরবর্তীতে তাকে আমতলী উপজেলা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে -
বরগুনা পৌরসভার সচিব রফিকের বদলি প্রসঙ্গে: বরগুনা পৌরসভার সচিব রফিকের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিজ জেলায় দীর্ঘ সময় কর্মরত ছিলেন এবং গত বছর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সম্প্রতি তাকে পটুয়াখালী জেলায় বদলি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা এই বদলিকে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
অভিযোগকারীদের প্রতিক্রিয়া: দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে আসা অভিযোগকারীরা প্রশাসনের সাম্প্রতিক বদলির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে শুধু বদলি নয়, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তও প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি— সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগের নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। সরকারি নিয়োগে স্থায়ী ঠিকানা ও যোগ্যতা যাচাই আরও কঠোর করতে হবে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়াও বদলির পাশাপাশি অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বিঃদ্রঃ এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিভিন্ন অভিযোগ অভিযোগকারী ও স্থানীয় সূত্রের দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News