অলিউল্লাহ ইমরান, বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনার সদর উপজেলায় সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া প্রবাসী আফাং শিকদার (৪৭)-এর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ, বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ নিয়ে বিরোধ এবং কথিত পরকীয়া সম্পর্কের জেরে পরিকল্পিতভাবে বিষপ্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বরগুনা সদর উপজেলার কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের চালিতাতলা গ্রামের বাসিন্দা আফাং শিকদার দীর্ঘ ১৩ থেকে ১৪ বছর মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের এপ্রিল মাসে তিনি দেশে ফেরেন। নিহতের বড় ভাই দুলাল শিকদার বরগুনা সদর থানায় দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, বিদেশে থাকা অবস্থায় আফাং শিকদার জমি কেনার জন্য স্ত্রী রাবেয়া বেগমের কাছে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, ওই অর্থের বড় একটি অংশ জমি কেনার পরিবর্তে অন্যত্র ব্যয় করা হয়েছে। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, নিহতের স্ত্রী রাবেয়া বেগমের সঙ্গে স্থানীয় এক ব্যক্তির পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এ বিষয়টি নিয়েও পারিবারিক অশান্তি চলছিল এবং পূর্বে এ সংক্রান্ত বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। স্বজনদের অভিযোগ, গত ১৯ জুলাই রাতে বরগুনা পৌরসভার আমতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় আফাং শিকদারকে জোরপূর্বক বিষপান করানো হয়। অসুস্থ অবস্থায় তাকে প্রথমে বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২৪ জুলাই রাতে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে স্বজন ও এলাকাবাসী বরগুনা-পুরাকাটা আঞ্চলিক মহাসড়কের চালিতাতলা এলাকায় মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা নিহতের স্ত্রী, মেয়ে ও শাশুড়িকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ফেলে এবং তাদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
থানা সূত্রে জানা গেছে, নিহতের ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় রুজু করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে নিহতের স্ত্রী রাবেয়া বেগম (৩৮), লতাবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা মো. হাসান (৪০), নিহতের মেয়ে আতিকা, শ্বশুর ও শাশুড়ির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্ত্রী রাবেয়া বেগম, মেয়ে আতিকা (২২) এবং শাশুড়ি রাশেদা বেগম (৭০)-কে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাদাত মো. হাসনাইন পারভেজ বলেন, "মৃত্যুর ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য আলামতের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে। বিষপ্রয়োগের অভিযোগ, অর্থনৈতিক বিরোধ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে।"
বরগুনার পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা বলেন, "ঘটনার পরপরই পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। একটি হত্যা মামলা রুজু হয়েছে এবং কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে। কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এদিকে, আফাং শিকদারের মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় জনমনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News