পাথরঘাটা প্রতিনিধি: ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বরগুনার পাথরঘাটার বিষখালী নদীতে শুরু হয় জেলেদের নৌকার ব্যস্ত আনাগোনা। সূর্যের প্রথম আলো নদীর ঢেউ আর উপকূলের সবুজের সঙ্গে মিলেমিশে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। তবে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে পরিবেশগত নানা সংকট।
বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস উপলক্ষে সরেজমিনে পাথরঘাটার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীতীরের অনেক স্থানে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। নদীর পাড়জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, সচেতনতার অভাব এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে এসব বর্জ্য শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক পরিবেশও হুমকির মুখে পড়ছে। নদী-খালবেষ্টিত উপকূলীয় জেলা বরগুনা একসময় প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, মৎস্যসম্পদ ও নৌ-যোগাযোগের জন্য সুপরিচিত ছিল। কিন্তু পরিকল্পিত নদীশাসনের অভাব, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, দূষণ এবং দীর্ঘদিন ড্রেজিং না হওয়ায় জেলার নদী-খালগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। এর ফলে একদিকে যেমন নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিষখালী, বলেশ্বর ও খাকদোনসহ বিভিন্ন নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছর ভাঙনে শত শত পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারাচ্ছে। অনেক স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, বাজার ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন বিভাগের বনায়নও, ফলে উপকূল রক্ষাকারী বেড়িবাঁধ আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার অভাবই ভাঙন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
স্থানীয় জেলে আবদুল করিম বলেন, "আগের মতো নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। নদীর পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। সবাই যদি নদী পরিষ্কার রাখত, তাহলে প্রকৃতিও ভালো থাকত, আমরাও উপকৃত হতাম।"
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক মহিউদ্দিন এসএমসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, উপকূলীয় এলাকার মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হলেও প্রকৃতি রক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নদী-খাল পরিষ্কার রাখার মতো উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে পাথরঘাটার উপকূলীয় এলাকায়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকা উভয়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণ, নদী ও জলাভূমি রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারলে এসব ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস উপলক্ষে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ এবং ‘পাথরঘাটা উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন’ সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে। সংগঠন দুটির প্রত্যাশা, দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃতি রক্ষায় মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। বন বিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, "প্রকৃতির অন্যতম অংশ বন রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে জনবল সংকটের কারণে দায়িত্ব পালনে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে বনায়নের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।" এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাথরঘাটা সেকেন্ড অফিসার (এসও) বিন নুরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পিএইচডি গবেষক রোবায়েত খন্দকার বলেন, "পাথরঘাটা উপজেলা এখনো ঘূর্ণিঝড় সিডরের ক্ষত বহন করছে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের একটি বড় অংশ এ অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করেছে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বন সংরক্ষণ ও বনায়নের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসে আমাদের আরও বেশি করে গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করতে হবে।"
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল বলেন, "প্রকৃতি রক্ষায় প্রশাসন সব সময় সজাগ রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ ও প্রকৃতির ক্ষতিসাধনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের উৎস নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকারও প্রধান ভিত্তি। তাই পাথরঘাটার নদী, বন, জীববৈচিত্র্য ও উপকূল রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই একটি নিরাপদ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News