নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা: দক্ষিণ উপকূলের জেলা বরগুনা। পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীবেষ্টিত এই জনপদে বর্ষা যেমন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য নিয়ে আসে, তেমনি নিয়ে আসে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা, ফসলহানি ও মানুষের দীর্ঘশ্বাস। চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই নদীর পানি বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ বেড়েছে। কোথাও নদীভাঙন, কোথাও জলাবদ্ধতা, আবার কোথাও ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। জেলার তালতলী, পাথরঘাটা, আমতলী, বেতাগী, বরগুনা সদর ও বামনা উপজেলার নদীতীরবর্তী জনপদগুলো বর্ষা এলেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। প্রতিদিন জোয়ারের তীব্র স্রোতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার এবং ধর্মীয় উপাসনালয় নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
বিশেষ করে বরগুনা সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে উপকূলীয় দুর্ভোগ প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জোয়ার এলেই ভাঙা ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ফলে তলিয়ে যায় বাড়ির আঙিনা, পুকুর, সড়ক ও কৃষিজমি। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বহু পরিবার।
নলটোনা ইউনিয়নের বাসিন্দা সেলিম শাহনেওয়াজ বলেন, “আমরা বছরের পর বছর একই কষ্ট ভোগ করছি। জোয়ার এলেই বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বহুবার বেড়িবাঁধ মেরামতের দাবি জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। এখন মনে হয় আমরা যেন রাষ্ট্রেরই ভুলে যাওয়া মানুষ।” তিনি আরও বলেন, “আগে আমাদের জমিতে ভালো ধান হতো। এখন নদীভাঙনে অনেক জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। যেটুকু জমি আছে, সেখানে লবণাক্ত পানি ঢুকে ফসল নষ্ট করছে। ফলে কৃষি আর আগের মতো লাভজনক নেই।” স্থানীয়দের মতে, বরগুনাবাসীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলার বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ। বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও অনেক স্থানে স্থায়ী সমাধান হয়নি। সামান্য বৃষ্টি ও জোয়ারেই কোথাও বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করছে, আবার কোথাও ভাঙা অংশ দিয়ে নিয়মিত জোয়ারের পানি ঢুকে কৃষিজমি ও বসতবাড়ি প্লাবিত করছে। বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে কৃষি খাত। অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে আমনের বীজতলা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছেন। জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকায় রোপণ কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছরই কমছে ফসলি জমির পরিমাণ। একসময় যেখানে ধান, মরিচ, তিলসহ বিভিন্ন রবি ফসল উৎপাদিত হতো, সেই জমির বড় অংশ এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে জমি হারিয়ে জীবিকার সংকটে পড়ছেন কৃষকেরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও স্রোতের তীব্রতা বাড়ায় নদীভাঙনের ঝুঁকিও বাড়ছে।
জলাবদ্ধতাও জেলার অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খাল দখল, ভরাট এবং পুনঃখননের অভাবে বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিক্ষা, যোগাযোগ ও জনস্বাস্থ্যে। বর্ষাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থাও হয়ে পড়ে নাজুক। অনেক কাঁচা সড়ক কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। কোথাও কালভার্ট ও সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে ভোগান্তি বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাতেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্লাবিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ, জ্বর ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। বরগুনার পর্যটন ও পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, “বরগুনার নদী, বন ও সমুদ্র এই জেলার সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু নদীভাঙন, অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল বেড়িবাঁধ শুধু মানুষের ঘরবাড়িই নয়, পরিবেশ ও পর্যটনের সম্ভাবনাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতসহ উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা এলে আমরা একই দৃশ্য দেখি—মানুষের কান্না, ভাঙন আর প্লাবন। অথচ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে এই ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।” তবে বর্ষা মৌসুম শুধু দুর্ভোগ নয়, সম্ভাবনারও বার্তা নিয়ে আসে। এ সময়ে নদী-নালায় ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। জেলার হাজারো জেলে নতুন আশায় নদীতে নামেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ইলিশভিত্তিক অর্থনীতি বরগুনার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত এবং নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনাও বর্ষাকালে নতুন মাত্রা পায়। পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বর্ষাভিত্তিক পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, “বরগুনার নদীভাঙন ও বেড়িবাঁধ সমস্যা নতুন নয়। বছরের পর বছর মানুষ একই দুর্ভোগে রয়েছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক সংস্কার করা হয়, যা পরবর্তী বর্ষায় আবার ভেঙে যায়। এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগও কমছে না।” তিনি আরও বলেন, “শুধু বেড়িবাঁধ মেরামত করলেই হবে না। নদীশাসন, খাল পুনঃখনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।” স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ, নদীশাসন, খাল পুনঃখনন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষকদের ক্ষতিপূরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। বরগুনার মানুষের এই সংগ্রামকে কেবল ত্রাণনির্ভর না রেখে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News