প্রায় ৩৫ কোটির বেশি অবৈধ সম্পদ, সন্ত্রাস-দখলবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ সমূহ:

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: বরগুনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শওকত হাছানুর রহমান রিমন-এর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভয়ভীতি সৃষ্টির অভিযোগে নতুন করে আইনি তৎপরতা শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশনার পর তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে।
দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় দায়ের হওয়া জি.আর মামলা নং-০৬/২০২৪ পর্যালোচনা শেষে বরগুনার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত রিমন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ সাময়িকভাবে ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার ও যানবাহন অবিলম্বে ফ্রিজ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত আয়কর কর্তৃপক্ষকে তার আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণীও তলব করেছেন। আগামী ১০ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে বিস্ময়কর আর্থিক অসামঞ্জস্যের তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সাবেক এই এমপির মোট অর্জিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৭ কোটি ৮ লাখ টাকা। বিপরীতে পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। অথচ গ্রহণযোগ্য ও বৈধ আয়ের পরিমাণ মাত্র ১ কোটি ১১ লাখ টাকা।
তদন্তে দুদকের হিসাব অনুযায়ী, আনুমানিক ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সম্পদের কোনো বৈধ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের সময় সম্পদের তথ্য গোপন করা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে সম্পদ হস্তান্তরেরও চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
দুদকের অনুসন্ধানে তার স্ত্রীর নামেও প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮২ টাকার সন্দেহজনক সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বরগুনা-২ এলাকায় ভয়ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে নিজস্ব অনুসারীদের নিয়ে শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন তিনি।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি-কে একাধিকবার হত্যাচেষ্টার ঘটনায়। এছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর এবং শতাধিক মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার নানা অভিযোগও রয়েছে সাবেক এই আওয়ামী লীগের ক্ষমতাশালী এমপির। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় আওয়ামী লীগ আমলে তিন থেকে চার বার তিনি বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম মনিকে প্রচেষ্টা পরিকল্পনা ও হামলা করে বসেন যাতে তিনি কোনভাবেই তার নিজ নির্বাচনী এলাকায় না আসতে পারেন, যতবারই নুরুল ইসলাম মনি বরগুনাতে আসার চেষ্টা করেছেন তার উপরে অতর্কিত হামলা চালায় এবং পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে এলাকা থেকে দূরে রাখেন। মনির সমর্থকদের উপর সব সময় এলাকা ছাড়া করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি যেন পাথরঘাটায় যেতেন!!
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা এমনকি রাজনৈতিক সহকর্মীদেরও নানা ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও জমি দখলের অভিযোগ:
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে সাবেক এই এমপির বিরুদ্ধে। আইনজীবী প্রিয়াঙ্কা মিত্র-এর পরিবারের মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল এবং প্রতিনিধিকে মারধরের মতো অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচিত হয়। এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল।
সরকারি প্রকল্পের অর্থ লোপাটের অভিযোগ:
টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেও একাধিকবার সমালোচনায় আসেন রিমন। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে হাইকোর্ট পর্যন্ত রুল জারি করেছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়নের নামে বরাদ্দ এলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্প ছিল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। এতে জনগণের উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধিই ছিল মূল লক্ষ্য।
পারিবারিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক: এক যুগ ক্ষমতায় থাকা চিহ্নিত রাজাকার পুত্র শওকত হাসানুর রহমান রিমনের জন্মস্থান পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়ন। রিমনের বাবা খলিলুর রহমান রায়হানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রিমনের বাবা ছিলো পিস কমিটির চেয়ারম্যান (পাকিস্তানপন্থী নেতা)। তিনি শত-শত মুক্তিযোদ্ধাকে খুন করছে। রায়হান পুর ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আওয়ামী পরিবারের সুনামধন্য নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধ শহীদ মজিবুর রহমান কনক মিয়াকে নিজ হাতে নির্মম ভাবে হত্যা করে এই রাজাকার খলিলুর রহমান।
পাথরঘাটা এলাকার মানুষ সাবেক এমপি রিমনকে রাজাকার পুত্র বা খুনির পুত্র হিসেবে সর্বদা ঘৃণা করে। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে এলাকায় রিমন রাজনীতিতে পরিচিতি হতে শুরু করে। একপর্যায়ে রিমন তার নিজস্ব ইউনিয়ন রায়হানপুরে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। এরপর তিনি পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে বরগুনা-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য গোলাম সবুর টুলু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে উপনির্বাচনে রিমন ওই আসনের আওয়ামী লীগের নেতাদের বিস্মিত করে অদ্ভুতভাবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এরপর ২০১৪ সালের দশম ও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই আসন থেকে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হয়ে এক যুগ ৩টি উপজেলার সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার অবিচার ও নির্যাতন চালিয়েছে। সরকারি জমি দখল করে ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মাণ এবং সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ ও সরকারি তহবিল তসরুপছাড়াও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাক্তিগত কর্মীদের সরকারি সুযোগসুবিধা পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ আছে এই রাজাকার পুত্র রিমনের নামে। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরে রিমন পাহাড়সম সম্পদশালী হয়েছে। ব্যবসার ধরন ও আকার বৃদ্ধি করছে কয়েকগুণ।
পাথরঘাটার বৃহৎ বাজার কাকচিরায় দোকান নির্মাণ করছে সড়কের ওপরেই। পাথরঘাটার বহু মসজিদ মাদ্রাসায় সরকারি বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি আত্মসাৎ করছে সাবেক এই এমপি রাজাকার পুত্র রিমন। পাথরঘাটা উপজেলার পশ্চিম জালিয়াঘাটা খানকায় লতিফিয়া জামে মসজিদে গত এক যুগে সরকারি কোন অর্থ বরাদ্দ না পেয়ে মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ক্বারী আব্দুল খালেক হুজুর বলছেন রিমন এমপি থাকা অবস্থায় তাদের মসজিদ সরকারি সাহায্য থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে।
২০১৩ সালে বরগুনা-২ আসনের উপনির্বাচনে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়ার পর কিছু সংবাদ মাধ্যমে তার বাবা খলিলুর রহমান পটুয়াখালী মহাকুমা রাজাকার বাহিনীর চেয়ারম্যান ছিলেন বলে খবর বের হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় রিমনের বিরুদ্ধে বিজয় দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করার নির্দেশ জারি করে। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের অংশ হয়ে রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে গড়ে ওঠা অবৈধ সম্পদ ও প্রভাববলয়ের বিরুদ্ধে আদালতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে বরগুনা-২ এলাকার মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে এটিকে “দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা” হিসেবে দেখছেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, অভিযুক্তের সম্পত্তি হস্তান্তর, বিক্রি বা আর্থিক লেনদেন থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এখন মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এবং ১০ আগস্ট ২০২৬-এ আদালতে জমা পড়া প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।

সূত্র: আদালতের নথি, দুদকের তথ্য, স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News