পাথরঘাটা প্রতিনিধি: বরগুনার পাথরঘাটায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত হয়েছে, যার মধ্যে সহায়-সম্বল হারানো সুরমা বেগমের চায়ের দোকানটিও রয়েছে। শোকের আবহে জীবিকা হারানো ব্যবসায়ীদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের লেমুয়া বাজারে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো বাজার এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে মুদি, মনোহরী, ফার্মেসি ও পোশাকের দোকানসহ অন্তত ৪৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। এই বিপর্যয়ের সময় লেমুয়া গ্রামের বাসিন্দা সুরমা বেগম নিজের মায়ের মৃত্যুশোক সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বিকেল সাড়ে চারটায় তাঁর মা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এবং বাড়ির উঠানে মরদেহ রেখে দাফনের প্রস্তুতি চলছিল। এমন চরম সংকটের মুহূর্তে নিজের একমাত্র আয়ের উৎস চায়ের দোকানের অগ্নিকাণ্ডের খবর পেলেও মায়ের লাশের পাশে উপস্থিত থাকার দায়বদ্ধতা থেকে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যেতে পারেননি। ফায়ার সার্ভিসের পাথরঘাটা, মঠবাড়িয়া ও বামনা স্টেশনের তিনটি ইউনিট দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে বাজারের অধিকাংশ দোকান ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে লেমুয়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি, যেখানে পোড়া গন্ধ আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে ব্যবসায়ীরা নিজেদের সর্বস্ব হারানোর আর্তনাদ করছেন। সুরমা বেগমের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যারা সাত বছর ধরে কষ্টার্জিত উপার্জনে সংসার চালিয়ে আসছিলেন, তারা আজ পথের ভিখারি হওয়ার উপক্রম হয়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগুনের সূত্রপাত এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বাজারের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দায়ী। অনেক ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই আগুনের তীব্রতায় মালামাল সরানোর ন্যূনতম সুযোগটুকুও তারা পাননি। সুরমা বেগমের মতো যারা শোক ও অভাবের দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন, তাদের জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়। দোকানের ছাইয়ের স্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষতিগ্রস্তরা এখন সরকারি সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো পুনরায় দাঁড় করানো যে দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, তা স্পষ্ট।
অগ্নিকাণ্ডের পর মঙ্গলবার সকালেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বরগুনার জেলা প্রশাসক মিজ্ তাছলিমা আক্তার, পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা এবং পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পাল। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আহাজারি এবং সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করে জেলা প্রশাসক জানান, বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর সরকারিভাবে আর্থিক অনুদান প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন। পাশাপাশি বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা হিসেবে ৩০ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে ১৫ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ ও এক বস্তা করে শুকনো খাবার প্রদান করা হয়। এছাড়া ২৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মালিককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
লেমুয়া বাজারের এই অগ্নিকাণ্ড কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি স্থানীয় ক্ষুদ্র অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। সুরমা বেগমের মতো প্রান্তিক মানুষের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে যাওয়া তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News