বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর কক্ষ থেকে এক নারী ও তার দুই শিশুকন্যার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, পুলিশ ঘটনার রহস্য উন্মোচনে তদন্ত শুরু করেছে।
বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর তৃতীয় তলা থেকে বুধবার বিকেলে এক নারী ও তার দুই শিশুকন্যার মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। নিহত নারী স্মৃতি রানী কালিবাড়ী এলাকার বাসিন্দা এবং ওই ডাকবাংলোর একজন অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে, যখন ডাকবাংলোর ৩ নম্বর কক্ষ থেকে ছয় বছর বয়সী এক শিশুকন্যার মরদেহ বিছানায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরবর্তীতে পাশের ৪ নম্বর কক্ষের দরজা ভেঙে স্মৃতি রানী ও তার প্রায় দুই বছর বয়সী আরেক শিশুকন্যার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে এটি হত্যাকাণ্ড বলে প্রতীয়মান হলেও অপরাধের মোটিভ বা নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে প্রশাসন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় এলাকায় জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ডাকবাংলোর মতো একটি সুরক্ষিত ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এমন নারকীয় হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী স্মৃতি রানীর স্বজনদের অভিযোগ, কর্মক্ষেত্রে তার কোনো শত্রুতা ছিল কি না অথবা ডাকবাংলোর ভেতরে বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি। স্থানীয়দের মতে, ডাকবাংলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি নিশ্ছিদ্র হতো, তবে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে ঘাতকের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। ঘটনার ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক পূর্বপরিকল্পিতভাবে এবং অত্যন্ত সুকৌশলে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে, যা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইব্রাহিমসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বরগুনা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আ. আলীম জানিয়েছেন, মামলার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক বিশেষায়িত টিম মাঠে কাজ করছে। ডাকবাংলোর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং ওই সময়ে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে না পারলেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বেশ কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ডাকবাংলোর মতো সরকারি স্থাপনায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল কি না এবং দায়িত্ব পালনে কেউ অবহেলা করেছেন কি না, তা নিয়েও অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের প্রভাব বরগুনার জননিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। একটি সরকারি ডাকবাংলোয় মা ও দুই শিশুর মৃত্যু সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। যদি ডাকবাংলোর ভেতরের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে এই জাতীয় স্থাপনাগুলো অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ মানুষের এই ভীতি দূর করা সম্ভব হবে। পুলিশের তদন্তের ওপর এখন সম্পূর্ণ বিষয়টি নির্ভর করছে, যার দিকে তাকিয়ে আছে পুরো বরগুনাবাসী।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News