বরগুনা জেলা প্রতিনিধি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের সরকারি তালিকায় বরগুনার কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অভিযোগ জানান স্থানীয় সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন সাবেক সমন্বয়ক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকায় থাকা কিছু ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে জুলাই আন্দোলনে আহত নন। তাদের দাবি, ব্যক্তিগত বিরোধ বা অন্য ঘটনায় আহত হয়েও কয়েকজন সরকারি তালিকায় ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত ও আহতদের সহায়তার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দেশব্যাপী বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে তালিকা প্রণয়ন করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় আন্দোলনে ১০ জন নিহত হন। পরে ২০২৫ সালের ৪ মার্চ প্রকাশিত গেজেটে বরগুনার ১০৪ জন এবং একই বছরের ২৫ জুলাই আরও ৫ জনের নাম আহত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে তালিকা প্রকাশের পর থেকেই এর যথার্থতা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনের দাবি, তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তির নাম রয়েছে, যাদের আন্দোলনের সময় মাঠে দেখা যায়নি। তাদের মতে, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে তালিকার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ যাচাই প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ মার্চ প্রকাশিত বরিশাল বিভাগের আহতদের তালিকায় ৩১৭ নম্বরে সুমন মৃধার নাম রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি ৫ আগস্ট নিজ গ্রামে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে আহত হন এবং পরে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই চিকিৎসার নথির ভিত্তিতেই তিনি আহত জুলাই যোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। স্থানীয়দের আরও দাবি, তার পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।এলাকাবাসীর ভাষ্য, যারা প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনে অংশ নেননি, তাদের কেউ কেউ এখন সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যক্তি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়েছেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাবেক সমন্বয়ক দাবি করেন, বরগুনায় ৫ আগস্ট উল্লেখযোগ্য কোনো আন্দোলন বা হামলার ঘটনা ঘটেনি। তাদের ভাষ্য, সুমন মৃধা নামে একজন ব্যক্তি মাদকসংক্রান্ত বিরোধে সংঘর্ষে আহত হলেও এখন নিজেকে জুলাই আন্দোলনের আহত হিসেবে দাবি করছেন, যা তাদের মতে সত্য নয়। আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকা শিক্ষার্থী সাইফুল শিকদার বলেন, তিনি ৫ আগস্ট বরগুনায় বিজয় মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। তার দাবি, সেদিন কোনো হামলা বা সংঘর্ষের ঘটনা তিনি দেখেননি! তিনি বলেন, প্রকৃত আহতদের তালিকাভুক্ত করতে এবং ভুয়া দাবিদারদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
একই তালিকার ৩০৩ নম্বরে থাকা মোহাম্মদ মোরতুজা, যিনি পেশায় কাঠ ব্যবসায়ী, দাবি করেন তিনি ৪ আগস্ট বরগুনার মাছ বাজার এলাকায় হামলার শিকার হয়ে আহত হন। তবে আন্দোলনে সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থীদের দাবি, ওই দিন মাছ বাজার এলাকায় কোনো আন্দোলন বা হামলার ঘটনা ঘটেনি। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তথ্যমতে, আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট আহত হিসেবে মোট ২১ জনের তথ্য পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮ জনকে ৫ আগস্ট আহত দেখানো হয়েছে। অথচ আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাধিক শিক্ষার্থীর দাবি, ওই দিন বরগুনায় ছাত্র-জনতার কোনো সংঘর্ষ বা আন্দোলনের ঘটনা ঘটেনি।
বরগুনার অন্যতম সাবেক সমন্বয়ক মুহিদ হাসান নিলয় বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে ৫ আগস্টের বেশ কয়েকটি প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে আহতদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসনের এক অনুষ্ঠানে আহত তালিকাভুক্ত অনেককেই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীরা চিনতে পারেননি। তার দাবি, ভুয়া আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হবে। এদিকে আরেক সাবেক সমন্বয়ক মো. রেজাউল করিম বলেন, বরগুনায় জুলাই আন্দোলনের সূচনা থেকেই তারা সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে আহত হিসেবে যাদের নাম দেখা যাচ্ছে, তাদের অনেককেই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে তারা চেনেন না। তার মতে, অন্য ঘটনায় আহত হয়ে কেউ যদি জুলাই যোদ্ধা পরিচয়ে রাষ্ট্রীয় সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে তা প্রকৃত আন্দোলনকারীদের প্রতি অবিচার এবং রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুমন মৃধা। তার দাবি, ৫ আগস্ট বিজয় মিছিল শেষে কাটপট্টি এলাকা থেকে ফেরার পথে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কর্মীদের হামলায় তিনি আহত হন। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় তিনি একা নন, আরও কয়েকজন আহত হয়েছিলেন। একইভাবে মোহাম্মদ মোরতুজাও অভিযোগের বিষয়ে নাকচ করে বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মাছ বাজার এলাকার দিকে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হয়ে তিনি আহত হন!
এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক মিজ্ তাছলিমা আক্তার বলেন, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো আসেনি। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে ---
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারী ও আহতদের প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে তালিকার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ যাচাই জরুরি বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা, সাবেক সমন্বয়করা এবং সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আহতদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুয়া দাবিদারদের চিহ্নিত করা গেলে আন্দোলনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রকৃতদের কাছেই পৌঁছাবে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News