'বাবা কখন ফিরবে?'—দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ৫ বছর বয়সী ছোট্ট সাজিদুলের কাছে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা এটাই—বাবা আর ফিরবেন না। তবে পরিবারের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা অন্তত জুলাই শহীদ মিজানুর রহমানের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও স্বপ্নময় করে তুলবে:
বরগুনা সদর উপজেলা প্রতিনিধি: গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলেই পাঁচ বছর বয়সী সাজিদুল ইসলামের মনে একটাই প্রশ্ন জাগে—‘বাবা কখন ফিরবে?’ কখনও সে স্বপ্ন দেখে, বাবা তাকে কোলে তুলে আইসক্রিম কিনে দিচ্ছেন। কখনও মনে পড়ে বাবার কিনে দেওয়া নতুন সাইকেল চালানোর স্মৃতি। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর বাস্তবতা তাকে বারবার জানিয়ে দেয়—তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না! বরগুনা সদর উপজেলার কালিরাতবাক এলাকার বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর পরিবার এখনো শোক, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। বিশেষ করে তাঁর দুই সন্তান—মেয়ে সামিয়া আক্তার পিঙ্কি ও ছোট ছেলে সাজিদুল ইসলাম—বাবার শূন্যতা প্রতিনিয়ত অনুভব করছে। ছোট্ট সাজিদুল তার হৃদয় ভাঙা কণ্ঠে বলে, “আমি এখনো স্বপ্নে দেখি, আমার বাবা আমাকে কোলে তুলে নিয়ে আইসক্রিম খাওয়াতে যান -- তিনি আমাকে একটা সাইকেল কিনে দেন। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমি আমার বাবাকে আর খুঁজে পাই না....”
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন মিজানুর রহমান। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মিজানুর রহমানের বাবা জাকির হোসেন দুলাল বলেন, বড় ছেলে হিসেবে পরিবারের মূল দায়িত্ব ছিল মিজানুরের কাঁধে। তাঁর মৃত্যুর পর দুই নাতি-নাতনিকে আগলে রাখার চেষ্টা করলেও বাবার অভাব পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ছোট নাতি প্রায়ই বাবার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এবং বিশ্বাস করে, সেখানে এখনো তার বাবার গন্ধ রয়েছে। বৃদ্ধ দাদা ইউনুস হাওলাদার বলেন, নাতি মিজানুর ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও দায়িত্বশীল। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু পুরো পরিবারকে গভীরভাবে ভেঙে দিয়েছে। এদিকে, স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন জাকিয়া আক্তার শিরিন। তিনি বলেন, সন্তানদের মানুষ করাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। সরকারি সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। একটি স্থায়ী চাকরি ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা হলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত হতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। মিজানুর রহমানের মা শাহিনুর বেগমও সহায়তার দাবি জানিয়ে বলেন, “আমরা আজ আছি, কাল হয়তো থাকব না। তাই আমাদের নাতি-নাতনিদের শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ থাকে, সে জন্য সরকারের স্থায়ী উদ্যোগ প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে বরগুনার সূযোগ্য জেলা প্রশাসক মিজ্ তাছলিমা আক্তার বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। যেসব পরিবারের নিজস্ব বাড়ি নেই, তাদের সরকারি জমিতে আবাসনের ব্যবস্থা এবং মানবিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে পাশাপাশি পরিবার গুলোর কর্মক্ষম সদস্যদের কর্মসংস্থানের আওতায় আনতেও কাজ চলছে। এছাড়া বরগুনা জেলা প্রশাসন কর্তৃক সর্বদা জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এবং শহীদদের প্রতি সর্বদা মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়ানো থাকবে -
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News