বরগুনা পৌর এলাকায় পানি নেই, আছে শুধু দুর্ভোগের দীর্ঘশ্বাস!
সাইফ সোহেল, বিশেষ প্রতিনিধি: বরগুনা পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনের মহান উদ্দেশ্যে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল দুটি সুবিশাল ওভারহেড ট্যাংক। প্রতিশ্রুতি ছিল—ট্যাংক দুটি চালু হলেই পৌরসভার সাপ্লাই লাইনে নিশ্চিত হবে ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বিন্দুমাত্র বাস্তবায়ন দেখেনি বরগুনা পৌরবাসী। উল্টো অব্যবস্থাপনা আর প্রশাসনিক উদাসীনতায় কোটি টাকার প্রকল্প এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিশুদ্ধ পানির তীব্র হাহাকারে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে বরগুনা শহরের বাগানবাড়ি ও থানাপাড়া রোড এলাকায় প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার দুটি ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল—পৌর এলাকার দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট চিরতরে দূর করা।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বরগুনা পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, এই ট্যাংকগুলোতে পানি ওঠার কথা ছিল ১৯৯৮ সালে নির্মিত পুরনো পানি শোধনাগার থেকে। খাকদোন নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের জন্য ক্রোক এলাকায় নির্মিত ওই শোধনাগারটি গ্রাহক সংকটের অজুহাতে ২০১২ সালেই বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘকাল অব্যবহৃত থাকায় ভেতরের মূল্যবান যন্ত্রাংশ হয় নষ্ট হয়েছে, নতুবা চুরি হয়ে গেছে। এর ওপর মূল সঞ্চালন লাইন ও সংযোগের কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় আজ পর্যন্ত একটি ফোঁটা পানিও তোলা সম্ভব হয়নি এই আধুনিক জলাধারগুলোতে। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, শোধনাগারের জন্য নির্ধারিত ও খাকদোন নদী থেকে পানি এনে প্রথম ধাপের শোধনের কাজে ব্যবহৃত পুকুরগুলো পরবর্তীতে মাছ চাষের জন্য লিজ দেওয়া হয়, যা প্রকল্পের কার্যকারিতাকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বর্তমানে বরগুনা পৌর এলাকায় ১ লক্ষ ৩০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। তাদের প্রতিদিনের পানির চাহিদা মেটাতে উত্তোলন করা হচ্ছে প্রায় ৮০ লাখ লিটার ভূগর্ভস্থ পানি। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত হারে পানি তোলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে নিচে নেমে গেছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পৌর এলাকার টিউবওয়েলগুলোতে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময়ে সামান্য দূরত্বেই টিউবওয়েল থেকে সহজে খাবার পানি সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু এখন অধিকাংশ টিউবওয়েল পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে।
পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাখালী এলাকার বাসিন্দা সাখাওত হোসেন মাসুদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বর্তমানে দিনে মাত্র ৫ ঘণ্টা আর্থাৎ সকালে ২ ঘণ্টা এবং বিকেলে ৩ ঘণ্টায় পানি সরবরাহ করা হয়। এর ওপর তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে নির্ধারিত ওই সময়ে বিদ্যুৎ না থাকলে পানি পাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। ফলে আমাদের এলাকার অধিকাংশ বাসার রিজার্ভ ও ছাদের ট্যাংকগুলো সম্পূর্ণ খালি থাকছে, যা জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।’
পৌর এলাকার ১নং ওয়ার্ডের আইনজীবী সমিতি সড়ক এলাকার বাসিন্দা অ্যাড. মনোয়ারা আক্তার তীব্র আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ—এই চরম দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিন। ওভারহেড ট্যাংকগুলোকে শতভাগ সচল করে সাপ্লাই লাইনে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করুন।’
৮ নং ওয়ার্ডের গ্রীন রোড এলাকার মর্জিনা মাহমুদা বলেন, কয়েক বছর আগে পৌর কর্তৃপক্ষ প্রকল্প চালুর আশ্বাস দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটার প্রতি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা আদায় করে প্রায় ৪ হাজার পানির মিটার স্থাপন করলেও সেই ট্যাংকগুলো থেকে এক ফোঁটা পানিও সরবরাহ করা যায়নি।
সঞ্চালন লাইনের কাজের এই দীর্ঘসূত্রিতা ও স্থবিরতার বিষয়ে বরগুনা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব সজল চন্দ্র শীল জানান, ‘সঞ্চালন লাইনের অভাবে এই ওভারহেড ট্যাংকিগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি।’ তবে এই সংক্ষিপ্ত আশ্বাসেই কি কাটবে বরগুনা পৌরবাসীর পানির তৃষ্ণা? নাকি আরও একটি মেগা প্রকল্প ফাইলবন্দী হয়েই থাকবে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
৬ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে অকেজো পড়ে থাকা একদিকে যেমন অপচয়, অন্যদিকে লাখো মানুষের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে একধরনের নিষ্ঠুর উপহাস। সংশ্লিষ্ট উচ্চ মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং টেকসই পদক্ষেপই পারে বরগুনা পৌরবাসীকে এই পানির বন্দিশালা থেকে মুক্তি দিতে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News