বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনার মাঠজুড়ে এখন তরমুজের সমারোহ। পরিপুষ্ট তরমুজ যেন হাসিমুখে উঁকি দিচ্ছে মাঠের চারদিকে। অনুকূল আবহাওয়ায় এ বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো দামের আশায় বুক বেঁধেছিলেন চাষিরা। কিন্তু সেই রঙিন স্বপ্নে নেমেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। পরিবহন সংকট ও বাজারজাতকরণ সমস্যায় উদ্বেগ আর হতাশা ঘিরে ধরেছে উপকূলীয় জেলা বরগুনার হাজারো তরমুজ চাষিকে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বরগুনার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনও হয়েছে ব্যাপক। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারজাতকরণে সংকট তৈরি হওয়ায় কৃষকদের লাভের মুখ দেখা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা জানান, রমজান মাসে আগাম তরমুজ বিক্রি করতে পারা কিছু কৃষক লাভবান হলেও বর্তমানে অধিকাংশ কৃষক পড়েছেন বিপাকে। জ্বালানি সংকটের অজুহাতে পরিবহন সংকট দেখা দেওয়ায় ক্ষেতের তরমুজ সময়মতো বাজারে নিতে পারছেন না তারা। এতে একদিকে ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দামও কমে গেছে।
তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের কৃষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, চলতি বছরে প্রায় আট একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। প্রতি একরে দুই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু পরিবহন সংকটে তরমুজ বাজারে নিতে না পারায় অনেক তরমুজ ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা দেউলিয়া হয়ে যাবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের কৃষক মো. আব্দুল লতিফ মাতুব্বর জানান, ধারদেনা করে তরমুজ চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবহন সংকটে এখন বিনিয়োগের টাকাই ওঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সদর উপজেলার তরমুজ চাষি হাবিবুর রহমান বলেন, আগে সহজেই ট্রাক পাওয়া গেলেও এখন জ্বালানি সংকটের অজুহাতে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। যে অল্পসংখ্যক পরিবহন পাওয়া যাচ্ছে তার ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ। আগে ঢাকায় তরমুজ পাঠাতে যেখানে ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা লাগত, এখন সেখানে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। এতে পাইকাররাও তরমুজ কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বরগুনা শহরের আড়তদার মো. শাহীন বলেন, পাইকাররা আসতে পারছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারে তরমুজের চাপ বেড়ে গিয়ে দাম কমে গেছে।
আরেক আড়তদার মো. মনিরুল আলম জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাজার আবার চাঙ্গা হতে পারে। তবে বর্তমানে চাষি ও ব্যবসায়ী উভয়েই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
স্থানীয় সমাজসেবক আবু সালেহ শান্ত বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় পরিবহন সংকট প্রকট। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিপুল পরিমাণ তরমুজ ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক রথীন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, জ্বালানি সংকটের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের কারণে তৈরি হয়েছে। চাষিরা স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে পাম্প থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন। ইতোমধ্যে সদর উপজেলার অনেক চাষি ও পাইকারকে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগী কৃষকরা স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে তরমুজ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সংগ্রহের প্রত্যয়নপত্র নিতে পারবেন। এতে করে দ্রুত বাজারজাতকরণ সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News