বরগুনা জেলা প্রতিনিধি : বরগুনায় খালার করা ফৌজদারি রিভিশন মামলায় ৩ বছর ৪ মাস বয়সী নাবালিকা কন্যাকে তার পিতার জিম্মায় দিয়ে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখেছেন বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালত। গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) এক যুগান্তকারী রায়ে আদালত এই আদেশ দেন। এর ফলে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে শিশুটি তার প্রাকৃতিক ও আইনগত অভিভাবক পিতার কাছেই ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেল। মামলার বিবরণী ও আইনজীবীর সূত্রে জানা যায়, বরগুনা সদরের বাসিন্দা মো: রাকিবুল ইসলাম রাজনের স্ত্রী মোনালিসা জেরিন গত ২০২৫ সালের ৬ জুন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর থেকে তাদের ৩ বছর বয়সী একমাত্র কন্যা সন্তান মোসাঃ রুকাইয়া ইসলাম ইয়ানাকে নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে জিম্মাসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। মৃত স্ত্রীর বড় বোন (শ্যালিকা) ও ভিকটিমের খালা সারমিন সুলতানা আসমা দাবি করেন, জন্মের পর থেকেই শিশুটি তার কাছে লালিত-পালিত হয়ে আসছে এবং পিতা মো: রাকিবুল ইসলাম রাজন শিশুটিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অবৈধভাবে আটক করে রেখেছেন। এই অভিযোগে তিনি গত ২৭ মে ২০২৬ তারিখে বরগুনার বিজ্ঞ বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০০ ধারায় একটি মামলা (এমপি মামলা নং- ৩০২/২০২৬) দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে পুলিশ গত ৪ জুন শিশুটিকে উদ্ধার করে আদালতে হাজির করে এবং বাদীর জিম্মায় প্রদান করে মামলাটি পরবর্তী ধার্য্য তারিখে আইনানুগ আদেশের জন্য রাখেন। পরবর্তী ধার্য্য তারিখ গত ১৮ জুন বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মামলাটি নথিজাত করে নাবালিকা কন্যাকে তার পিতার জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেন। বিজ্ঞ নির্বাহী আদালতের ওই আদেশের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়ে বাদী সারমিন সুলতানা বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন। গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রিভিশন মামলার শুনানি শেষে বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালত নিম্ন আদালতের রায়ই বহাল রাখেন এবং শিশুটিকে তার পিতার জিম্মায় বহাল রেখে রায় প্রদান করেন। বিবাদী পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম সোহেল আদালতকে জানান, মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট অনুযায়ী পিতা হলেন নাবালক সন্তানের স্বাভাবিক ও আইনগত অভিভাবক। পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় এবং সন্তানের হেফাজত পিতার নিকট থাকলে, তা কোনো অবস্থাতেই ফৌজদারি কার্যবিধির ১০০ ধারার অধীনে "অন্যায় আটক" বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। ফলে ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ১০০ ধারার অধীন এই মামলাটি আদালতে চলতেই পারে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিবাদীর মৃত স্ত্রীর সাথে পূর্বে থেকেই বাদীর বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা ও পারিবারিক বিরোধ চলে আসছিল। বিবাদীর মরহুমা স্ত্রী জীবিত থাকাবস্থায় বরগুনা বিজ্ঞ সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে দেওয়ানি এবং বিজ্ঞ অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এবং বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই মূলত বাদী এই কাল্পনিক ও সাজানো মামলাটি দায়ের করেছিলেন। বিবাদীর মা (নাবালিকার দাদী) একজন সুস্থ-সবল ও স্নেহপরায়ণ মহিলা হওয়ায় পিতা ও দাদীর যৌথ তত্ত্বাবধানে শিশুটি অত্যন্ত নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে লালিত-পালিত হচ্ছে। আদালতের রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে শিশুটির পিতা রাকিবুল ইসলাম রাজন বলেন, আমার স্ত্রী জীবিত থাকাকালীনও তার পরিবারের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল না। জমিজমা নিয়ে তাদের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমাও চলছিল। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে আমি, আমার মা ও বাবা মিলে আমার মেয়েকে লালন-পালন করে আসছি। তাদের সঙ্গেও মেয়ের মাঝে মধ্যে দেখা করার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ করে কোরবানির ঈদের পর পুলিশ দিয়ে আমার কাছ থেকে আমার মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হয়। অপর দিকে শিশুর খালা বলেন, শিশুটির মা মারা যাবার পরে আমি তাকে সন্তানের মত লালন পালন করেছি। বিজ্ঞ আদালতের এই যুগান্তকারী রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বিবাদী প্রতিপক্ষের আইনজীবী মো. সাইফুল ইসলাম সোহেল বলেন, এই আদেশের মাধ্যমে আইনের সঠিক প্রয়োগ হয়েছে এবং নাবালিকা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত হয়েছে।
আদালতের যুগান্তকারী রায় ৩ বছরের শিশু কন্যার জিম্মা পেলেন পিতা
- প্রকাশের সময় : Sep 9, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: বরগুনায় ৩ বছরের শিশু কন্যাকে পিতা রাকিবুল ইসলাম রাজনের জিম্মায় বহাল রাখার নির্দেশ দেন বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালত।
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News