বিশেষ প্রতিবেদন: বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় নোনা পানির অনুপ্রবেশ দিন দিন তীব্র হওয়ায় সুপেয় পানির সংকটে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় মিঠা পানির উৎসগুলো ক্রমেই লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক পরিবারকে দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে জীবন চালাতে হচ্ছে। পদ্মা বহিরচর গ্রামের বাসিন্দা শারমিন বেগমের বাস্তবতা এই সংকটেরই একটি প্রতিচ্ছবি-
এলাকার নলকূপের পানিও লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় তা পান বা দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী নয়। আবার ভূগর্ভে পাথর থাকায় নতুন নলকূপ স্থাপন করাও কঠিন। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্ভর করতে হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকটি মিঠা পানির পুকুরের ওপর।
ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় লবণাক্ত পানিতে এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর অধিকাংশ পুকুরের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমানে যে কয়েকটি পুকুরে তুলনামূলক মিঠা পানি রয়েছে, সেখান থেকেই মানুষ পানি সংগ্রহ করছেন। পান করার আগে সেই পানি শোধন করতে হচ্ছে।শারমিনের প্রতি মাসে প্রায় ৩০ ড্রাম পানি প্রয়োজন। প্রতিদিন কাঁধে কলসি নিয়ে তাকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। তার ভাষায়, ঝড়-বৃষ্টি কোনো কিছুই এই কাজ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয় না। কারণ পানি সংগ্রহ না করলে পরিবারের পান করার মতো পানি থাকে না।
পানির জন্য শুধু অর্থ ব্যয় নয়, শারমিন ও অন্য নারীদের দিতে হচ্ছে দীর্ঘ সময় এবং শারীরিক শ্রম। প্রতি লিটার পরিশোধিত পুকুরের পানি কিনতে হয় প্রায় ১ টাকা দরে। কিছু এনজিওর স্থাপিত পানি পরিশোধন ব্যবস্থার পানি কিনতে খরচ হয় লিটারপ্রতি প্রায় ২ টাকা। তবে স্থানীয়দের মতে, পানির দামই সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়; বরং পানি বাড়ি পর্যন্ত বহন করাই তাদের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর। একই দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন আসমা খাতুন। তিন সন্তানকে অন্যের কাছে রেখে তাকে পানি আনতে যেতে হয়। ফলে পানির সংকট শুধু স্বাস্থ্য বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি নারীদের দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সময় ব্যবস্থাপনায়ও বড় চাপ তৈরি করছে। সরকারি সহায়তায় বিভিন্ন এনজিও পাথরঘাটায় সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে। কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) বাড়ির পাশে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছে। এসব ট্যাংকে প্রায় ৩ হাজার লিটার পর্যন্ত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যায়, যা সারা বছর পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে। কোডেকের তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় ইতোমধ্যে ১৮৩টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। এ উদ্যোগের অর্থায়নে রয়েছে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF)। পিকেএসএফের তথ্য অনুযায়ী, রিভার্স অসমোসিস (RO) প্ল্যান্ট ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ব্যবস্থা স্থাপনে ছয়টি উপকূলীয় জেলায় প্রায় ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। বরগুনা ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও কক্সবাজার এই কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে।
২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে ছয় জেলায় ১ হাজার ৬৮৮টি পরিবারকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।পাথরঘাটায় সুপেয় পানির সংকটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পানির সরবরাহের একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। পৌরসভা ও ইউনিয়ন এলাকার কয়েকটি নির্দিষ্ট পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করে তা ভ্যানে করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। হুমায়ুন আহমেদ প্রায় ২০ বছর ধরে এভাবে পানি বিক্রি করছেন। তার মতো আরও প্রায় ১০ জন পানি সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। অনেক সময় যানবাহন সরাসরি বাড়ির কাছে যেতে না পারায় গ্রাহকদের রাস্তার পাশে এসে পানি সংগ্রহ করতে হয়। অর্থাৎ, নিরাপদ পানি এখন অনেক পরিবারের জন্য মৌলিক অধিকার নয়, বরং নিয়মিত কিনে নিতে হয় এমন একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে। পাথরঘাটা পৌরসভার প্রায় ৫ হাজার ৬০০ জোতের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯০০ গ্রাহক বর্তমানে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি পাচ্ছেন। বাকি পরিবারগুলো পুকুর, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা অথবা বিভিন্ন ধরনের পানি পরিশোধন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। পৌর কর্তৃপক্ষ আগামী দুই বছরের মধ্যে পুরো পৌর এলাকাকে পাইপলাইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। তবে এর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করেই চলতে হবে। পাথরঘাটার বাসিন্দাদের আরেকটি অভিযোগ হলো পানিতে অতিরিক্ত লোহার উপস্থিতি। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহনেওয়াজের মতে, এই পানি ব্যবহারের ফলে অনেকেই চর্মরোগে ভুগছেন। পানির পাত্র বা ড্রামে পানি রাখলে অল্প সময়ের মধ্যেই লালচে আস্তরণ তৈরি হয়। ফলে সংকটটি শুধু ‘পানি পাওয়া যাচ্ছে কি না’—এমন প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। যে পানি পাওয়া যাচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে পাথরঘাটার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পাল জানিয়েছেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পৌরসভা এবং এনজিওগুলোর সমন্বয়ে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় কাজ চলছে।
বরগুনার জেলা প্রশাসক মিজ্ তাছলিমা আক্তার জানিয়েছেন, পাথরঘাটায় শিঘ্রই ১০টি পানি পরিশোধন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্র চালু হলে পানির সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা যাচ্ছে,,
পাথরঘাটার সংকটকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে মিঠা পানির উৎস, কৃষিজমি, ভূগর্ভস্থ পানি এবং মানুষের জীবিকা একই সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সরকারি মৃত্তিকা লবণাক্ততা মানচিত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশের চাষযোগ্য জমির মধ্যে প্রায় ১০.৫৬ লাখ হেক্টর লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ বেড়ে অন্তত ১১.৫৬ লাখ হেক্টরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ হেক্টর বা ১ হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন এলাকা লবণাক্ততার কবলে পড়েছে। পাথরঘাটার মানুষের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনো দূরবর্তী বা ভবিষ্যতের সংকট নয়—এটি এখনই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত করছে। সুপেয় পানির জন্য নারীদের দীর্ঘ পথ হাঁটা, পানি কিনতে পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়, শিশুদের রেখে পানি সংগ্রহে যাওয়া, পানির মান নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি গভীর মানবিক সংকটের রূপ নিয়েছে। এ অবস্থায় শুধু অস্থায়ীভাবে পানি সরবরাহ নয়; দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পানির স্থায়ী অবকাঠামো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কার্যকর পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, পাইপলাইনের সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততার বিস্তার মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। কারণ পাথরঘাটায় আজ যে পানির সংকট দেখা দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের আরও উপকূলীয় এলাকায় আগামী দিনে একই বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News