আতিকুর রহমান ইশতি, বরগুনা প্রতিনিধি: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকারিভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালিত হলেও বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় এসব ক্লিনিকে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা রাখার কথা থাকলেও অনেক কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) সময়মতো দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়া এবং সেবা প্রদানে বৈষম্যের অভিযোগও রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট ১৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিক থেকে সপ্তাহে ছয় দিন প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা এবং ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্লিনিক নির্ধারিত সময়ে খোলা হয় না, আবার সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ সেবাপ্রত্যাশীদের। অনেক এলাকায় শনিবারও ক্লিনিক বন্ধ পাওয়া যায়। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গত শনিবার (৪ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বরগুনা সদর উপজেলার খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, "ক্লিনিক সকাল ৯টায় খোলার কথা থাকলেও প্রায়ই ১০টার পরে খোলে। ওষুধ নিতে আসা মানুষকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। আবার অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধও পাওয়া যায় না।"
পরেরদিন রোববার (৫ জুলাই) সকালে খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সঙ্গীতার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, "আমি অসুস্থ থাকায় শনিবার একটু আগে চলে গিয়েছিলাম। প্রায়ই অসুস্থ থাকি। তবে প্রতিদিনই নিয়মিত ক্লিনিকে আসি।"
অসুস্থতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "না, কাউকে জানানো হয়নি।"
এদিকে পার্শ্ববর্তী কুমড়াখালী কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, ক্লিনিক ইচ্ছামতো খোলা ও বন্ধ করা হয়। পরিচিতদের প্রয়োজনমতো ওষুধ দেওয়া হলেও অনেক সাধারণ মানুষকে ওষুধ না দিয়েই ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রহিম বলেন, "শুক্রবার তো বন্ধ থাকেই, অনেক সময় শনিবারও ক্লিনিক বন্ধ পাওয়া যায়। সকাল ১০টার দিকে খোলে, আবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।"
আরেক বাসিন্দা বিপুল হওলাদার বলেন, "গ্রামের মানুষ যেন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।"
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুমড়াখালী কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি ফারহানা আক্তার। তিনি বলেন, "আমি নিয়মিত সময় অনুযায়ী ক্লিনিক পরিচালনা করি। কারও ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে অভিযোগ করা হতে পারে। গত তিন মাস ওষুধ সরবরাহ না থাকায় অনেক রোগী ওষুধ পাননি। এতে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমি নির্ধারিত সময়েই ক্লিনিকে উপস্থিত হই। মাঝে মধ্যে ১০ মিনিটের মতো হেরফের হতে পারে।"
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, "কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রতি সরকারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কোথাও সিএইচসিপির বিরুদ্ধে সময়মতো অফিস না করার অভিযোগ থাকলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্লিনিকগুলোর তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তাদেরও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।"
স্থানীয়দের দাবি, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং কার্যকর তদারকি জোরদার করা হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের সুফল আরও বাড়বে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News