তালতলী প্রতিনিধি: বরগুনার তালতলী উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের কাজে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও যোগসাজশের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে: এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি ‘ই-জিপি’ আইডি ব্যবহার করে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি যোগসাজশের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেননি! অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সরকারি ‘ই-জিপি’ আইডি ব্যবহার করে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়টি। সূত্রমতে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য এডিপির চতুর্থ ধাপে তালতলী উপজেলায় ৩৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বরাদ্দকৃত অর্থ সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা ছিল। চলতি মাসের ৩ জুন উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে প্রকল্প বাছাই কমিটির সভায় পূর্ববর্তী ধাপের ঘাটতি বাবদ ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা রেখে, ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার প্রকল্প ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি’ (পিআইসি) এবং ২১ লাখ ৯৬ হাজার টাকার ১৭টি প্রকল্প আরএফকিউ (RFQ) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প তালিকা অনুমোদন করা হয়। এই তালিকাটি প্রকল্প বাছাই কমিটির আহ্বায়ক ইউএনও এবং সদস্য সচিব উপজেলা প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত ছিল, যা পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি স্থাপন করে।
তবে, অভিযোগ উঠেছে যে আরএফকিউ পদ্ধতির নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে ২১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা ব্যয়ের ১৭টি প্রকল্পকে চারটি প্যাকেজে বিভক্ত করে ই-জিপিতে টেন্ডার আহ্বান করা হয়: এই টেন্ডার নোটিশটি এমনভাবে গোপন রাখা হয়েছিল যে, সাধারণ ঠিকাদাররা এর সম্পর্কে অবগতই হতে পারেননি! অভিযোগের তীর সরাসরি উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনের দিকে, যিনি তার পছন্দের কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই কারসাজি করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন নিবন্ধিত ই-জিপি ঠিকাদার জানান, তারা ৪৫/৫০ জন ঠিকাদার প্রায়শই সরকারি কাজে অংশ নেন, কিন্তু এই আরএফকিউ টেন্ডার সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গোপন রাখা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ ও যোগ্য ঠিকাদাররা দরপত্র জমা দেওয়ার ন্যূনতম সুযোগও পাননি। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রকৌশলী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাঁচটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্র দাখিলের ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে মেসার্স "প্রিন্স এন্টারপ্রাইজ", "মেসার্স নাইম এন্টারপ্রাইজ" এবং "আসিফ এন্টারপ্রাইজ" সহ মোট পাঁচটি লাইসেন্স ব্যবহার করে নামমাত্র প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয়, দরপত্র দাখিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চারটি প্যাকেজের কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়, যেখানে মেসার্স প্রিন্স এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স নাইম এন্টারপ্রাইজ দুটি করে প্যাকেজের কাজ পেয়েছে। এই দুই প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে চূড়ান্ত কনফার্মেশন বার্তাও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে, যা অভিযোগের সত্যতা আরও জোরালো করে। ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা এই পুরো অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই ধরনের অনিয়ম সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নষ্ট করে এবং যোগ্য ঠিকাদারদের নিরুৎসাহিত করে। উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনের ভাষ্যমতে, তিনি ইউএনও'র আইডি দিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেননি, বরং ইউএনও এই বিষয়ে এক্সপার্ট নন এবং অতীতে তার আইডি ব্লকও হয়েছিল। প্রকৌশলীর দাবি, তিনি নিজেই টেন্ডার প্রক্রিয়ার কাজ সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া সেই বাস্তবায়নের অংশ। এমপি মহোদয় পাঁচটি লাইসেন্স পাঠিয়েছিলেন, যা এখানে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের দিয়ে আবেদন করানো হয়েছে। পরবর্তীতে ওই লাইসেন্সগুলোর মধ্য থেকে দুটি লাইসেন্সকে কাজ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, বরাদ্দ পাওয়ার পর মাননীয় সংসদ সদস্যের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী কমিটির সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন করা হয়। এরপর উপজেলা প্রকৌশলীকে ইজিপি'র মাধ্যমে দ্রুত কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইউএনও'র দাবি, উপজেলা প্রকৌশলী টেন্ডার প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করার পর, হোপ আইডি থেকে রেসপন্সিভ দরদাতাদের অনুমোদন প্রদান করা হয়। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলো ঘটনার জটিলতা এবং তদন্তের প্রয়োজনীয়তাকেই নির্দেশ করে।
এই অনিয়মের ঘটনাটি শুধু তালতলী উপজেলাতেই নয়, বরং দেশব্যাপী সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। যদি এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তা সরকারি তহবিলের অপব্যবহার এবং দুর্নীতির একটি বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় হওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং ভবিষ্যতে যোগ্য ঠিকাদারদের নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের গুণগত মান নিয়েও সংশয় সৃষ্টি হতে পারে। তাই, এই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News