বরগুনা প্রতিনিধি: সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে বরিশালের বানারীপাড়া ও বরগুনার সদর উপজেলার দুইজন ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে যথাক্রমে অপসারণ ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বরিশাল ও বরগুনার দুই ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গত রোববার বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মামলার শুনানি শেষে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আছমা আক্তারকে চাকরি থেকে অপসারণ এবং বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার, খতিয়ান জালিয়াতি এবং সরকারি খাস জমি বেহাত করার মতো গুরুতর অনিয়মে জড়িত থাকার বিষয়টি বিভাগীয় তদন্ত ও শুনানিতে প্রমাণিত হওয়ায় এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বুধবার দুপুরের পর জনসমক্ষে আসার পর থেকেই ভূমি প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বানারীপাড়ার উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আছমা আক্তার তার দাপ্তরিক এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে মাছরং ও জম্বুদ্বীপ মৌজার এসএ খতিয়ান রেকর্ড সংশোধনের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হয়েছিলেন। একজন উপ-সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে এই ধরনের পরিবর্তনের আইনি কর্তৃত্ব তার না থাকা সত্ত্বেও তিনি ব্যক্তিগত সুবিধা বা দুর্নীতির উদ্দেশ্যে এই জালিয়াতি সম্পন্ন করেন, যা তিনি পরবর্তীকালে লিখিতভাবে স্বীকার করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, বরগুনার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে সরকারি খাস জমি বেহাত করার অভিযোগটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তিনি খাস খতিয়ানভুক্ত জমির রশিদ ও দাখিলা প্রদান করে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন, যা সরাসরি রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। এই দুই কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের ফলে ভূমি অফিসের স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে। বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ জানিয়েছেন, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ভূমি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত কোনো কর্মকর্তাকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে। অভিযুক্তরা তাদের অপরাধের স্বপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে অটল থাকে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবেই এই ধরণের কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়মিত অব্যাহত থাকবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তা সরকারি বিধিমালা অমান্য করার সাহস না পান।
এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভূমি অফিস নিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ প্রশমনে কিছুটা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তবে কেবল বহিষ্কার বা অবসরে পাঠানোই যথেষ্ট নয়, বরং ভূমি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল মনিটরিং এবং কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের নিয়মিত অডিট ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ের এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। তবেই কেবল ভূমি সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে এবং সরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে, যা বর্তমান প্রশাসনিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News