বরগুনা প্রতিনিধি (সাক্ষাৎকার: সাংবাদিক সোহাগ)- খাকদোন নদীর ঢেউ আর স্রোতের সঙ্গে প্রতিদিনই লড়াই করেন লিলি আক্তার (৪০)। হাতে বৈঠা, সামনে নদীর উত্তাল জল—এই দৃশ্যই এখন তাঁর জীবনের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বরগুনার ঢলুয়া–ফুলতলা নৌপথে প্রতিদিন যাত্রী পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এই নারী মাঝি। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে নৌকা চালান লিলি। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়—কোনো কিছুই সহজে থামাতে পারে না তাঁর বৈঠা। অথচ সারাদিনের পরিশ্রমের বিনিময়ে তাঁর আয় মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকা। এই সামান্য অর্থেই চলে তাঁর সংসার। পাশাপাশি অসুস্থ বৃদ্ধ মা পারুল বেগমের চিকিৎসার খরচও বহন করতে হয় তাঁকে। লিলির নৌকা চালানোর শুরুটা শৈশবেই। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে তিনি শেখেন নৌকা চালানো ও বৈঠা বাওয়া। ২০০৭ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাবাকে হারানোর পর সেই নৌকাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান অবলম্বন। এরপর কেটে গেছে বছরের পর বছর। নদীর বুকে বৈঠা চালিয়েই সংসারের হাল ধরে রেখেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন বৈঠা চালাতে চালাতে তাঁর দুই হাতে পড়েছে অসংখ্য ফোসকা। পরিশ্রমের চিহ্ন স্পষ্ট হাতজুড়ে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে থামার সুযোগ নেই। নদীর স্রোত যেমন প্রতিদিন নতুন করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, তেমনি দারিদ্র্যও তাঁকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে বাধ্য করে। লিলির জীবনসংগ্রাম শুধু একজন নারী মাঝির গল্প নয়; এটি প্রান্তিক এক নারীর আত্মনির্ভরতারও প্রতিচ্ছবি। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কঠিন পেশা তাঁর জন্য আরও দুরূহ হয়ে উঠছে। লিলির স্বপ্ন খুব বেশি নয়। তিনি চান একটি নিরাপদ ঘর, অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং বৈঠা হাতে নদীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে চলার বদলে একটি স্থায়ী জীবিকার ব্যবস্থা।
স্থানীয় প্রশাসন, সরকার কিংবা কোনো সহৃদয় ব্যক্তি তাঁর পাশে দাঁড়ালে লিলির জীবন বদলে যেতে পারে। একটি নিরাপদ আবাসন, মায়ের চিকিৎসায় সহায়তা অথবা টেকসই কোনো আয়ের ব্যবস্থা তাঁকে দিতে পারে নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ।
খাকদোনের ঢেউ প্রতিদিন লিলির বৈঠায় ছন্দ তোলে। সেই ছন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একজন নারীর দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম—যিনি হার মানেননি নদীর স্রোতের কাছে, হার মানেননি দারিদ্র্যের কাছেও।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News