পাথরঘাটা প্রতিনিধি: বরগুনার পাথরঘাটায় বজ্রপাতে সেলিম নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে এবং একই দিনে একটি তালগাছে বজ্রপাতের ফলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপাড়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে গত সোমবার ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে বজ্রপাতের ঘটনায় সেলিম নামের এক কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন। বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে সৃষ্ট এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি স্থানীয় জনজীবনে গভীর শোক ও আতঙ্কের ছায়া ফেলেছে। একই সময়ে পার্শ্ববর্তী ৪ নম্বর ওয়ার্ডে পনু মোক্তারের বাড়ির সামনের একটি সুউচ্চ তালগাছে বজ্রপাত আঘাত হানলে মুহূর্তের মধ্যে গাছটিতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। আকস্মিক এই বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, স্থানীয়রা মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে পড়েন এবং প্রাণহানির আশঙ্কায় গাছটির কাছাকাছি যাওয়ার সাহস পাননি। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে চলমান বৈরী আবহাওয়া এবং কালবৈশাখী ঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এই অঞ্চলে বজ্রপাতের ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, বজ্রপাতের পর তালগাছের চূড়া থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত পুরো গাছে ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ভীতি সঞ্চার করে। প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, গাছটি অত্যন্ত উঁচু হওয়ায় এবং আগুনের শিখা অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায় তা নেভানোর কোনো সুযোগ ছিল না। তারা জানান, বজ্রপাতের বিকট শব্দে বাড়ির চারপাশ কেঁপে ওঠে এবং আগুনের উত্তাপ থেকে বাঁচতে তারা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিতে বাধ্য হন। কৃষকদের অভিযোগ, মাঠের কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার জন্য কোনো ধরনের সতর্কবার্তা বা আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব রয়েছে, যার ফলে উন্মুক্ত মাঠে কাজ করা ব্যক্তিরা সবসময় মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন। সেলিম নামের ওই কৃষকের মৃত্যুতে তার পরিবারসহ পুরো ইউনিয়নে শোকের মাতম চলছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কালবৈশাখী ঝড়ের সময় মাঠের কাজ থেকে বিরত থাকতে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অসাবধানতাবশত অনেক কৃষক খোলা জায়গায় অবস্থান করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও তালগাছ বা সুউচ্চ গাছগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, বজ্রপাত প্রবণ এলাকাগুলোতে তালগাছ লাগানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, কেবল পরিকল্পনা সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে নজর দেওয়া জরুরি, কারণ গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় তৈরি করছে।
পরিশেষে, সোমবারের এই ঘটনাটি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। মুষলধারে বৃষ্টির কারণে তালগাছের আগুন নিজে থেকেই নিভে গেলেও, কৃষকের মৃত্যুতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই অস্থিতিশীল আবহাওয়া মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং কৃষকদের আধুনিক সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাথরঘাটার এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি বজ্রপাত নিরসনে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News