তালতলী প্রতিনিধি: বৈরী আবহাওয়ায় কুয়াকাটা উপকূলে এফবি মহিমা ট্রলারডুবির ঘটনায় কালাম নামের এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে শহিদ নামের অপর এক জেলে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। গত ৭ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে কুয়াকাটা উপকূল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার গভীর সমুদ্রে ১৮ জন জেলেসহ এফবি মহিমা নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর আশপাশের জেলেরা দ্রুত তৎপরতা চালিয়ে ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও নিখোঁজ হন শহিদ ও কালাম নামে দুই জেলে। ঘটনার চার দিন পর গত ১১ জুলাই সকালে কুয়াকাটা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ভাসমান অবস্থায় কালামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত কালামের মরদেহ সন্ধ্যায় তার নিজ বাড়ি বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের ছোট আমখোলা গ্রামে পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ অপর জেলে শহিদের সন্ধানে কোস্টগার্ড ও স্থানীয় জেলেরা বঙ্গোপসাগরে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন, যদিও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে নিখোঁজ জেলের অবস্থান শনাক্ত করা এখনো সম্ভব হয়নি।
ট্রলারডুবির এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, সমুদ্রের উত্তাল অবস্থার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও ট্রলারটিকে মাছ ধরার জন্য গভীরে পাঠানো হয়েছিল, যা এই প্রাণহানির প্রাথমিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিখোঁজ জেলে শহিদের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন যে, বৈরী আবহাওয়ার সতর্কতা উপেক্ষা করে ট্রলারটি সাগরে পাঠানো ছিল একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ছোট আমখোলা গ্রামের বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সমুদ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ট্রলার পরিচালনার ফলে আজ একটি পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে এবং অন্য একটি পরিবার প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় প্রহর গুনছে। জেলেদের দাবি, সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি নজরদারি এবং ট্রলার মালিকদের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি করা জরুরি ছিল।
ঘটনার বিষয়ে তালতলী ফকিরহাট মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মজিবর ফরাজি জানান, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার পর থেকেই জেলেদের সমুদ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল এবং মৎস্য সমিতির পক্ষ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তার দাবি, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ট্রলারটি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। সমিতির পক্ষ থেকে নিখোঁজ জেলে শহিদকে উদ্ধারে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা প্রচার করা হলেও কেন জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে নামছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও কঠোর না করা হলে উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের ট্রলারডুবির ঘটনা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
বঙ্গোপসাগরে একের পর এক ট্রলারডুবির ঘটনা উপকূলীয় মৎস্য আহরণ খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মাছ ধরার ট্রলারগুলোর সমুদ্রযাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি ট্রলারে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নিখোঁজ জেলে শহিদের উদ্ধার অভিযান সফল না হওয়া পর্যন্ত তার পরিবারের অনিশ্চয়তা কাটবে না। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে সমুদ্রগামী জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মৎস্য বিভাগ ও কোস্টগার্ডের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে বঙ্গোপসাগরে পেশাদার জেলেদের জীবনের ঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক মৎস্য অর্থনীতি ও উপকূলীয় জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবেই থেকে যাবে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News