নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা: বরগুনাজুড়ে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে গবাদিপশুর খুড়া (ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ-এফএমডি) ও লাম্পি রোগ। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে খামার থেকে শুরু করে বাড়ি-বাড়িতে আক্রান্ত হচ্ছে গরু। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিনের সংকটের কারণে চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় চরম উদ্বেগে রয়েছেন খামারি ও পশুপালকরা।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আক্রান্ত গরুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। অনেক গরুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কোরবানির ঈদের পর থেকেই রোগের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খুড়া রোগে আক্রান্ত গরুর মুখ ও পায়ে ঘা তৈরি হচ্ছে। মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা ঝরছে, খাবার গ্রহণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে খুরে ঘা হয়ে পচন ধরছে। অন্যদিকে লাম্পি রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে বড় বড় গুটি দেখা দিচ্ছে, পরে তা ফেটে ঘায়ে পরিণত হচ্ছে। আক্রান্ত গরুর জ্বর, দুর্বলতা ও খাদ্য গ্রহণে অনীহা দেখা দিচ্ছে। বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের মনসাতলী গ্রামের খামারি মিলন চন্দ্র জানান, তার সাতটি গরুর সবকটিই খুড়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চললেও বাজারে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় স্থানীয় পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বরগুনা সদরের বুড়িরচর ইউনিয়নের সোনাখালী গ্রামের তুহিন খান বলেন, দীর্ঘদিন এমন ভয়াবহভাবে খুড়া রোগ দেখা যায়নি। এবার একসঙ্গে অনেক গরু আক্রান্ত হওয়ায় খামারিরা আতঙ্কিত। অনেক পরিবারের এক বা দুটি গরুই একমাত্র সম্পদ হওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। খামারিদের অভিযোগ, ওষুধের সংকটকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে ওষুধ বিক্রি করছেন। ৬০ টাকার পোনার্পেন ইনজেকশন ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য ওষুধও দেড় থেকে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ওষুধ ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম শহিদ বলেন, অধিকাংশ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত সরবরাহ দিতে না পারায় চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। বরগুনা জেলা ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আহসান নাসিম বলেন, খুড়া ও লাম্পি রোগের কারণে জেলার খামারিরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। ওষুধের সরবরাহ না থাকায় অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা করাতে পারছেন না। বরগুনা সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও ভেটেরিনারি সার্জন ডা. বিথী দেবনাথ জানান, শুধু সদর উপজেলাতেই লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে।
কোরবানির ঈদের পর একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গরু আক্রান্ত হওয়ায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে চিকিৎসাসেবার চাপ বেড়েছে। তবে সীমিত জনবল নিয়েও সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রাণিসম্পদ বিভাগ আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, খামার জীবাণুমুক্ত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, খুড়া রোগ একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, বরগুনায় মোট গরুর সংখ্যা ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৩৭৯টি। তবে এর মধ্যে ঠিক কতটি গরু খুড়া বা লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং কতটির মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। তবে আগামী ২ জুলাই থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News