বরগুনা সদর উপজেলা প্রতিনিধি: পৈত্রিক সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে বরগুনার এক বৃদ্ধ রিকশাচালক তার চার ভাতিজার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, যার প্রেক্ষিতে আদালত পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন তলব করেছে।
বরগুনার অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছেন ৬০ বছর বয়সী রিকশাচালক আবদুল ওহাব মিয়া। গত মঙ্গলবার ১৬ জুন দায়েরকৃত এই মামলায় তিনি বরগুনা সদর উপজেলার পার্বতী গ্রামের মো. আবুল হোসেন খান, মো. কালাম খান, মো. আবু হানিফা খান ও মো. সেলিম খানসহ চারজনকে আসামি করেছেন। আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুজ্জামান মামলাটি আমলে নিয়ে বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ঘটনাটি সরেজমিনে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। মূলত পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত জমিতে নিজের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই বৃদ্ধ ওহাব মিয়া দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে বরগুনা সদর উপজেলায়, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার দাপট ও পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে মামলার বাদীকে। মূলত ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাদের উত্তরাধিকারীদের যোগসাজশে জালিয়াতি ও জবরদখলের মাধ্যমে এই সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, যা এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর বয়ান অনুযায়ী, আবদুল ওহাব মিয়ার বাবা আবদুল হামেজ ৫ একর ৭২ শতাংশ জমি রেখে মৃত্যুবরণ করেন। ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট হওয়ায় ওহাব মিয়াকে পরিকল্পিতভাবে পৈত্রিক ভিটা ও আবাদি জমি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তার ভাইয়েরা জীবিত থাকাকালে এসএ রেকর্ডের মাধ্যমে কৌশলে পুরো জমির দখল নিজেদের নামে নিয়ে নেন। পরবর্তীতে ভাইয়েরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের সন্তানরা বিএস রেকর্ড করার সময়ও ওহাব মিয়াকে সম্পূর্ণ আড়ালে রাখেন। ভুক্তভোগী আবদুল ওহাব মিয়া জানান, তার প্রাপ্য প্রায় সাড়ে ৮৩ শতাংশ জমি বর্তমানে আসামিরা ভোগদখল করছে। অভাবের তাড়নায় এই বয়সেও রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাকে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কোনো ছেলে সন্তান না থাকায় এবং আর্থিক দৈন্যদশায় থাকায় আসামিরা তাকে অসহায় মনে করে পৈত্রিক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করেছে। কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় বিবাহিত দুই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শেষ বয়সে তিনি নিজের প্রাপ্যটুকু ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তার এই অসহায়ত্ব ও ন্যায়বিচারের আকুতি স্থানীয় পর্যায়েও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিবাদী পক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আসায় স্থানীয় সমাজপতি বা আত্মীয়দের মাধ্যমেও কোনো সমাধান সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। আদালতের নির্দেশে পুলিশি তদন্ত শুরু হলে মামলার প্রকৃত চিত্র ও রেকর্ডের গরমিল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, উত্তরাধিকার আইন লঙ্ঘন করে কাউকে বঞ্চিত করা একটি বড় ধরনের অনৈতিক ও বেআইনি কাজ। আদালত এখন পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের পারিবারিক বিরোধ নিরসনে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যাতে একজন অসহায় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তার ন্যায্য পাওনা ফিরে পেতে পারেন।
এই মামলার রায় কেবল ওহাব মিয়ার জমি পুনরুদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রান্তিক মানুষের আইনি লড়াইয়ের একটি প্রতীকী দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্পদ জবরদখল ও উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার মতো সামাজিক ব্যাধি কীভাবে একজন বৃদ্ধকে রিকশা চালানোর মতো কঠিন পেশায় ঠেলে দেয়, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। আদালতের এই হস্তক্ষেপ যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তবে সমাজে সম্পত্তি জবরদখলের প্রবণতা কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে। ভবিষ্যতে পরিবহন খাতে বা নিম্নবিত্ত মানুষের যাতায়াতে এই ঘটনার প্রভাব সরাসরি না থাকলেও, পারিবারিক ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বার্তা দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে, যা সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে বৃদ্ধ আবদুল ওহাব মিয়ার শেষ জীবনের অবলম্বন ফিরিয়ে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করবে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News