বরগুনার বেতাগীতে শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাতের অভিযোগ: তদন্তের দাবি স্থানীয়দের-
বেতাগী প্রতিনিধি: বরগুনার বেতাগী উপজেলার ফুলতলা নুরুন্নেছা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগের নামে ৫ লাখ ৮ হাজার টাকা নেওয়া, প্রায় দেড় বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকা এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন তাঁর অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। অভিযোগের পর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও পরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল থেকে তাঁকে স্বপদে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়টির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুলতলা এলাকার জাহিদুল ইসলামকে বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে ৫ লাখ ৮ হাজার টাকা নেন প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমান। টাকা নেওয়ার পর নিয়োগ না দিয়ে তিনি নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
জাহিদুল ইসলামের বাবা বলেন, পরে তাঁরা জানতে পারেন, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর নামে কোনো সৃষ্ট পদই নেই। এরপর টাকা ফেরত চাইলে প্রধান শিক্ষক নানা টালবাহানা করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি!
এদিকে বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ১৮ মে থেকে চলতি বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমানের কোনো স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন!
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমীরুল ইসলাম বলেন, “প্রধান শিক্ষক প্রায় দেড় বছর ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।” এছাড়াও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, গত দেড় বছরে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হরেকৃষ্ণ অধিকারী ও সাদ্দাম হোসেন একাধিকবার বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের পরিদর্শনের সময়ও প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতির বিষয়টি হাজিরা খাতায় উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে না আসায় ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী তাঁকে চেনেই না। তাঁর অনুপস্থিতির কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে তাঁরা জানান।
বিদ্যালয়ের নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে এসব কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. শামিম বলেন, প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি ও নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০১৯ সালেও প্রায় সাত মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, তাঁদের নিয়োগের সময় বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের কথা বলে প্রধান শিক্ষক তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা নিয়েছেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগগুলোর বিষয়ে একাধিকবার প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি কোনো নোটিশের জবাব দেননি বলে দাবি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের!
পরে তাঁকে আবারও সাময়িক বরখাস্ত করে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের অনুমোদন চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশালে আবেদন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনের পর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল থেকে মুজিবর রহমানকে স্বপদে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশালের বিদ্যালয় পরিদর্শক সাইফুর রহমান হাওলাদার মুঠোফোনে বলেন, “মানবিক দিক বিবেচনায় তাঁকে বরখাস্ত না করে পুনরায় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
তবে কী কারণে দীর্ঘ অনুপস্থিতি, নিয়োগের নামে অর্থ নেওয়া এবং বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগের পরও তাঁকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি!
অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর অবস্থান প্রতিবেদনে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।
১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফুলতলা নুরুন্নেছা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়টি ১৯৮৬ সালে এমপিওভুক্ত হয়। দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতি, নিয়োগের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, বেতন-ভাতা উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন এবং সাময়িক বরখাস্তের পর পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়টির শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান শিক্ষক মুজিবর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। স্থানীয়দের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হলে বিদ্যালয়টির স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষা পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
দৈনিক শেষকথা Seshkatha News