
বীর মুক্তিযোদ্ধা মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রী-
পাথরঘাটা (বরগুনা) প্রতিবেদক : দেশের মায়ায় বাপ ও চাচার দেখাদেখি তিনিও মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করাই যে কাল হয়ে যাবে ভাবতেও পারেননি। বাবাণ্ডচাচা ও তিনি মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণ করার কারণে পাক বাহিনীরা ঘর বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রি বলেন, মেজর জিয়া অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করলে আজও স্বীকৃতি পেলাম না।
শুধু বাড়ি ঘর পুড়িয়েই শেষ হয়নি মা ও চাচিকে করেছে পাশবিক নির্যাতন। বাবা মনোহর মিস্ত্রী,চাচা মথুরানাথ মিস্ত্রী, কর্ণধর মিস্ত্রী এবং প্রতিবেশী মতিয়ার রহমানকে তালুক চরদয়ানী খেয়াঘাটে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে লাশ খালে ফেলে দেয়। আজও খুজে পায়নি লাশ। হারিয়েছে বাবাণ্ডচাচাকে। মাণ্ডচাচির সম্ভ্রব হারিয়েছে। একমাত্র বেচে থাকার স¤¦ল বসত ঘর তাও পুড়িয়ে দেয় পাক হানাদাররা। শোক আর অভাবণ্ডঅনটন নিয়ে বেঁচে আছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মনমথ মিস্ত্রী।
এতো কিছুর পরেও আজও আপে নিয়ে বেঁেচ আছেন মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রী। মেজর জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করলেও আজও মেলেনি স¦ীকৃতি; জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধের লড়াই করে স¦াধীন করে আজও লড়াই শেষ হয়নি তার। প্রতিমুহুর্তই তাকে কাঁদায়। স¦াধীনতার ৫৪ বছরে এসেও লড়াই করছেন তিনি। তার কথিত মতেণ্ড এখন শুধু অপারের দিনণ গুনছেন তিনি। বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের তালুক চরদুয়ানী গ্রামে নিভৃত পল্লীতে বসবাস করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মনমথ মিস্ত্রী।
কথা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রীর সাথে। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই উত্তরে বললেনণ্ড‘বেচে আছে শুধু কায়া (শরীর)। প্রতিণই ৭১ এর বিভিষিকাময় ঘটনা আমাকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে। এখন শুধু অপারে যাওয়ার অপোয় আছি। কখন ডাক আসে ওপার থেকে।’
তিনি বলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, কোন বিনিময়ের চিন্তা করিনি। বাবাণ্ডচাচা ও প্রতিবেশী মতিয়ার রহমানের অনুপ্রেরণায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মে মাসের প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধের একটি দল আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিলে আমি তাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাই। ৯ন¤¦র সেক্টরের মেজর জিয়া উদ্দিনের অধীনে বুকাবুনিয়া সাব সেক্টরে বামনা, পাথরঘাটা মঠবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেই।
মনমথ মিস্ত্রী বলেন, আমার বাবা মনোহর মিস্ত্রী, চাচা মথুরানাথ মিস্ত্রী, কর্ণধর মিস্ত্রী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, মা পারুল রাণী মিস্ত্রী ও চাচি পুষ্প রাণী বিরঙ্গনা হয়েও আজ অবহেলায় পড়ে আছি। আমার নাম সবুজ মুক্তিবার্তায় তালিকায় থাকলেও লাল মুক্তিবার্তায় আজও হয়নি। তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের কারণে আজও ভাতাপ্রাপ্ত হতে পারিনি। তিনি অভিযোগ করেন, আমার সকল বৈধ কাগজপত্র এবং উপজেলা, জেলা পর্যায় যাচাই বাইয়ে তালিকাভূক্তির জন্য চূড়ান্ত হলেও অজ্ঞাত কারণে আমার নাম বারবার বাতিল করা হয়। মেজর জিয়াউর রহমানের পুত্র আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, সে হিসেবে মুল্যায়ন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে অন্তত মৃত্যূর আগে স¦ীকৃতি দিবেন। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দপ্তরে কাগজপত্র নিয়ে গেলেও অজ্ঞাত কারণে ওই কাগজপত্র আর দপ্তরে থাকে না বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে সবশেষ ২০১৬ সালের ১৫ মার্চে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের প্রতিবেদনেও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রীর ভাতা পাওয়া সংক্রান্ত সুপারিশ করেছেন। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রী উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে ১৯৯৫ হতে ২০০০ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ৯ন¤¦র সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়া উদ্দিনের সনদ, একই সেক্টরের মেজর এম.এ জলিলের দেয়া সনদ, বুকাবুনিয়া সাব সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড আলমগীর হোসেনের সনদ রয়েছে।
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও আমরা মুক্তিযুদ্ধকে জানি’র প্রতিষ্ঠাতা শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, আমাদের অনুসন্ধান এবং ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায় মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রী একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় তার বাড়িতে পাকবাহিনীর সদস্যরা আগুন পুড়িয়ে ফেলেছে। তার বাবা এবং দুই চাচাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে। লাশ খুঁজে পায়নি তারা। মা এবং চাচির সম্ভ্রমহানি হয়েছে। এতো কিছুর পরেও ভাতা তো দূরের কথা তালিকাভুক্ত হতে পারেননি তিনি। তার স্বপক্ষে অনেক প্রমানপত্র থাকলেও কি কারনে তার ফাইল আটকে যায় তা আজো অজানা। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা সহ সকল রকমের সুযোগ সুবিধা পাওয়ার দাবিদার তিনি।
পাথরঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আলহাজ্ব এম.এ খালেক বলেন, মনমথ রঞ্জন মিস্ত্রীর পরিবার মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হয়েও আজও অবহেলা এবং নিগৃত অবস্থায় আছে। আমরা বারবার তার নাম সুপারিশ করলেও অজ্ঞাত কারণে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।