
বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনার উপকূলীয় জনপদে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক জটিল বাস্তবতা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে চীনের সহায়তায় বাস্তবায়িত উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ উঁচু ও শক্তিশালীকরণ এবং স্লুইস গেট নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার ঝুঁকি থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখা।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বহু স্থানে বিদ্যমান পাকা রাস্তার ওপর মাটি ফেলে বা রাস্তা কেটে তা কাঁচা রাস্তায় পরিণত করা হয়। এতে উন্নয়নের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ছয় বছর আগে। কিন্তু ওই সময় কাঁচা হয়ে যাওয়া রাস্তাগুলো পুনরায় পাকা করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। ফলে বরগুনার বিভিন্ন উপজেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব রাস্তা কাদায় পরিণত হয়ে যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আবার শুকনো মৌসুমে ধুলাবালির কারণে পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সামান্য যানবাহন চলাচল করলেই ধুলোর ঘন মেঘে ঢেকে যায় আশপাশের এলাকা। এতে রাস্তার দুই পাশে বসবাসকারী মানুষ শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, চোখের জ্বালা-পোড়াসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পোল্ডারভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়িবাঁধ উন্নয়ন কাজ হয়েছে। কয়েকটি পোল্ডারে ১১০ থেকে ১১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী এই পরিমাণ ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন পোল্ডারে নতুন স্লুইস গেট নির্মাণ এবং পুরোনো গেট সংস্কার মিলিয়ে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টির বেশি পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে।
তবে এসব উন্নয়নের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। আমতলী, তালতলী ও পাথরঘাটাসহ বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক স্থানে দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা সংস্কার না হওয়ায় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে এবং চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে রোগী পরিবহন বিলম্বিত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষিপণ্য ও মাছ বাজারজাত করতে বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হচ্ছে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যেভাবে পাকা রাস্তা নষ্ট করা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উন্নয়নের নামে মানুষের চলাচলের একমাত্র পথকে অচল করে দেওয়া হয়েছে। দ্রুত এসব রাস্তা পাকা না করলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট ছিল। বেড়িবাঁধ উন্নয়ন জরুরি হলেও একই সঙ্গে রাস্তা পাকাকরণের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা উচিত ছিল। এখন মানুষ প্রতিদিন কষ্ট ভোগ করছে।
আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল করিম জানান, আগে এই রাস্তায় সহজে চলাচল করা যেত। কিন্তু এখন শুকনো মৌসুমেও ধুলোর কারণে বাইরে বের হওয়া কষ্টকর হয়ে গেছে। শিশু ও বয়স্করা বেশি ভুগছেন এবং অনেকেই শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বরগুনা সদরের গোলবুনিয়া বাজারের ভ্যানচালক মো. সোহেল বলেন, কাঁচা রাস্তার কারণে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ধুলা ও খানাখন্দের কারণে প্রায়ই গাড়ি আটকে যায়। এতে আয় কমে গেছে এবং জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আক্তার জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয়। ধুলোর কারণে কাপড় নোংরা হয়ে যায় এবং শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়।
দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। কোথাও কোথাও প্রতিবাদের অংশ হিসেবে রাস্তায় ধানের চারা রোপণের ঘটনাও ঘটেছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল বেড়িবাঁধ শক্তিশালী করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখা। রাস্তা উন্নয়নের বিষয়টি আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও বাস্তব কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা করছেন, অন্যদিকে নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, বেড়িবাঁধ উন্নয়ন যেমন প্রয়োজনীয় ছিল, তেমনি সেই উন্নয়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দ্রুত পুনর্বাসন করাও এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই দুর্ভোগ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।