
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা: বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া ৯টি খাল পুনঃখননের ফলে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে স্থানীয় কৃষি ও জীববৈচিত্র্য। বহু বছর ধরে পানির অভাবে অনাবাদি পড়ে থাকা বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখন আবার চাষাবাদের আওতায় আসতে শুরু করেছে। এতে আশার আলো দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ প্রকল্পের আওতায় বরগুনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া সমবায় সমিতির অধীনে প্রায় ১৭ হাজার ৫৫২ দশমিক ৫ মিটার খাল পুনঃখনন করেছে। প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮৩ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের আওতায় নলবুনিয়া খাল, চিলু মাঝির খাল, সুন্দরিয়া খাল, সুন্দরিয়া ব্রাঞ্চ খাল, তাঁতিপাড়া খাল, চামোপাড়া খাল, মৌরাবির খাল, বথিপাড়া খাল এবং পাওয়াপাড়া–মাওয়াপাড়া খাল খনন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় এসব খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে খালগুলো প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়ায় পানির অভাবে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছিল। ফলে এলাকার অনেক জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকত।
নলবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ মিয়া বলেন, “শত বছর আগে এখানে বড় বড় খাল ছিল। ধীরে ধীরে পলি জমে খালগুলো মরে যায়। শুকনা মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ করা সম্ভব হতো না। এমনকি পান করার পানিসহ দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজেও সংকট দেখা দিত। এখন খালগুলো পুনঃখনন করায় আবার জীববৈচিত্র্যে প্রাণ ফিরে এসেছে।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাওয়াপাড়া–মাওয়াপাড়া খালসহ বিভিন্ন খালে এখন পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সেই পানি ব্যবহার করে কৃষকেরা নিজেদের জমিতে নালা কেটে সেচ দিচ্ছেন। একসময় যেখানে এক ফসলি জমি ছিল, সেখানে এখন তিন ফসলি জমিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিস্তীর্ণ মাঠ বোরো ধানের সবুজ চারায় ভরে উঠেছে।
শুধু ধান নয়, তালতলী উপজেলায় তরমুজের আবাদও ব্যাপক। কিন্তু পানির অভাবে অনেক এলাকায় তরমুজ চাষ সম্ভব হচ্ছিল না। খাল পুনঃখননের ফলে এখন সেই সম্ভাবনাও নতুন করে তৈরি হয়েছে।
নলবুনিয়া এলাকার কৃষক আলী হোসেন মিয়া বলেন, “খালগুলো কাটার ফলে এখন সারা বছর পানি পাওয়া যাবে। এতে বছরে তিনবার চাষ করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে বোরো ধানের আবাদ শুরু করেছি, কেউ কেউ তরমুজও চাষ করছেন।”
নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চু বলেন, “এই এলাকায় ৯টি খাল খননের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। আগে এখানে এক ফসলি জমি ছিল। এখন শুষ্ক মৌসুমেও কৃষকেরা পানি পাবেন এবং জলাবদ্ধতার সমস্যাও থাকবে না। কৃষিনির্ভর এই এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এই প্রকল্প বড় ভূমিকা রাখবে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ইলিয়াস বলেন, “তালতলীতে পানির সমস্যা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বোরো ধান ও তরমুজ চাষে সেচের অভাব ছিল। খালগুলো পুনঃখনন হওয়ায় কৃষকেরা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।”
তালতলী উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ প্রকল্পের আওতায় এই খালগুলো পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং স্থানীয় মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে।”
স্থানীয়দের আশা, খাল পুনঃখননের এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে তালতলীর কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।