প্রিন্ট এর তারিখঃ Apr 19, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Mar 24, 2026 ইং
বরগুনায় ‘জিনের মসজিদের’ স্থাপত্যশৈলীতে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বরগুনার ঐতিহাসিক "বিবীচিনী শাহী মসজিদ" আজও মুগ্ধ করছে দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের। দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ, নান্দনিক নকশা এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের কারণে এই মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে—প্রায় তিনশ বছর আগে জিন-পরির মাধ্যমে রাতারাতি এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এ কারণেই অনেকের কাছে এটি ‘জিনের মসজিদ’ বা ‘পরীর মসজিদ’ নামেও পরিচিত।
বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নে সুউচ্চ টিলার ওপর অবস্থিত এই শাহী মসজিদটি লাল ইটের গাঁথুনি, সুচারু অলংকরণ ও অনন্য স্থাপত্যশৈলীর জন্য সুপরিচিত। কয়েক শতাব্দী ধরে এটি কেবল ইবাদতের স্থানই নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবেও বিবেচিত। বর্তমানে মসজিদটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে Department of Archaeology Bangladesh-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট শাহ জাহান-এর শাসনামলে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এর আয়তন প্রায় ৩৩ ফুট লম্বা ও ৩৩ ফুট চওড়া এবং প্রতিটি দেয়াল প্রায় ৬ ফুট প্রশস্ত। ১৬৫৯ সালে সুদূর পারস্য থেকে আধ্যাত্মিক সাধক শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ দিল্লিতে আসেন। পরে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি বেতাগী এলাকায় এসে তৎকালীন সুবেদার শাহ সুজা-এর অনুরোধে এক গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তাঁর মেয়ে হায়াচ বিবি চিনির নাম অনুসারে মসজিদটির নামকরণ করা হয় ‘বিবিচিনি মসজিদ’।
তবে সে সময় এলাকাটি প্রায় জনমানবশূন্য থাকায় হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে মসজিদটি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা জন্ম নেয়—এটি জিন-পরিরা রাতারাতি নির্মাণ করেছে। সেই বিশ্বাস থেকেই এখনো অনেকেই মসজিদটিকে ‘জিনের মসজিদ’ নামে ডাকেন।
মসজিদটি দেখতে আসা পর্যটক মো. মিরাজ বলেন, “মসজিদটি প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো। এর স্থাপত্য সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। প্রাচীন নিদর্শন হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। তবে জায়গা ছোট হওয়ায় একসঙ্গে অনেক মানুষ নামাজ পড়তে পারেন না। যদি জায়গা বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে আরও বেশি মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন।”
একটি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত মো. আহাদ রহমান বলেন, “চাকরির সুবাদে বেশ কয়েকবার এখানে এসেছি। প্রতিবারই মসজিদের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এর ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারিভাবে আরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সবুজ হোসেন জানান, “আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি এই মসজিদ জিন-পরিরা এক রাতেই তৈরি করেছে। মসজিদটি আগে আরও উঁচুতে ছিল এবং পাশের একটি পুকুর থেকেও নাকি গায়েবিভাবে অনেক কিছু পাওয়া যেত।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আব্দুল শুক্কুর মোল্লা বলেন, “আগের মানুষদের মুখে শুনেছি জায়গাটি একসময় ঘন জঙ্গল ছিল এবং বাঘ-ভাল্লুকের বসবাস ছিল। তাই অনেকেই মনে করেন মানুষের পক্ষে তখন এখানে মসজিদ নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না।”
ঐতিহাসিক এই মসজিদে প্রায় ২০ বছর ধরে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, “ইতিহাস অনুযায়ী মসজিদটি শাহ নেয়ামতউল্লাহ নির্মাণ করেছেন। তবে সে সময়ের কোনো মানুষ এখন জীবিত নেই, তাই অনেকে বিভিন্ন গল্প প্রচলিত করেছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই এটিকে গায়েবি মসজিদ বলেও মনে করেন।”
তিনি আরও জানান, এক সময় মসজিদটি ঘন জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে জঙ্গল পরিষ্কার করে এটি আবিষ্কার করা হয়। দীর্ঘদিন এখানে শুধু জুমার নামাজ আদায় করা হতো।
উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে বেতাগী উপজেলা প্রশাসন প্রথম মসজিদটি সংস্কার করে। পরে ১৯৯২ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে ও নামাজ আদায় করতে আসছেন।
© স্বত্বাধিকার : আবেদীন প্রিন্টিং প্রেস ও সোহাগ কনস্ট্রাকশন