
ঢাকা প্রতিনিধি: রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় অবস্থিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে গত শনিবার গভীর রাতে ভয়াবহ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। দুই ট্রাক ভর্তি একদল সন্ত্রাসী অতর্কিত এই হামলা চালিয়ে আবাসন প্রকল্পের আওতাধীন পুরো প্রপার্টি ও স্টুডিওটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে!
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু সালমান মুক্তাদির বা তার স্টুডিও ছিল না, বরং নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের মালিক সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মো. নাজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে আরজুর সাথে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই এই সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে-
ঘটনার সময় হামলাকারীরা ভবনের মূল প্রবেশপথে নির্মাণ করা নতুন গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়, যা মূলত নাজিমুদ্দিনের অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার মালিকানাধীন জমির অংশ পুনরুদ্ধারের একটি সহিংস প্রক্রিয়া ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে!
ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী থেকে ভূমিদস্যু নাজিমুদ্দিন: দুই ডজন মামলার আসামি ও একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব---
দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী থেকে নাজিমুদ্দিন ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। ২০১০ সালে রাজধানীতে আগমনের পর ভাসানটেকে ভাঙারি ও থাই গ্লাসের ব্যবসা দিয়ে শুরু করলেও, সময়ের সাথে সাথে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি আব্বাসের ছত্রছায়ায় আবাসন ব্যবসায় সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ভুক্তভোগী সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, নাজিমুদ্দিন প্রভাব খাটিয়ে জোয়ারসাহারা মৌজায় প্রায় ১৪ বিঘা জমি দখল করে রেখেছেন, যার মধ্যে ৮ কাঠা জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ বিদ্যমান। নাজিমুদ্দিন এই জমিগুলোতে অবৈধভাবে গেট নির্মাণ করে সংশ্লিষ্ট প্রকৃত মালিকদের যাতায়াত পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, বারবার আইনি প্রতিকারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নাজিমুদ্দিনের পেশিশক্তির কাছে তারা জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন। এছাড়া নাজিমুদ্দিন নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে গুলশান আজাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করে আসছেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে ২০২৪-এর সরকার পতনের পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে দলের সাথে সম্পৃক্ত নয় বলে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দায়েরকৃত হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি নাজিমুদ্দিন বর্তমানে জামিনে মুক্ত থেকে পুনরায় এসব অপকর্মে লিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে! তার বিরুদ্ধে বিগত দিনে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং সংবাদ মাধ্যমে অসংখ্য সংবাদের তথ্য ও উপাত্ত পাওয়া গিয়েছে!
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে, ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত মূল পরিকল্পনাকারীসহ মোট ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের শনাক্তকরণ ও আটকের অভিযান চলমান রয়েছে। এদের মধ্যে একজন যুবলীগ নেতা, আরেকজন বঙ্গবন্ধু প্রজন্মলীগ নেতা অন্যজন জামাত নেতা- প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেড এবং এক অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ বিদ্যমান, যা এই সহিংসতার মূল কারণ। এদিকে, হামলার পরপরই সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেছিলেন যে এটি চাঁদা না দেওয়ার ফল হতে পারে, তবে পরবর্তীতে জমি দখলের বিষয়টি সামনে আসায় পরিস্থিতির জটিলতা স্পষ্ট হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, নাজিমুদ্দিন কর্তৃক নির্মিত অবৈধ গেট ভাঙার উদ্দেশ্যেই এই হামলা পরিচালিত হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর পথ আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর দায়িত্ব বর্তায় যে, ঢাকা সেনানিবাসের মতো সংবেদনশীল এলাকার কাছে কীভাবে একজন চিহ্নিত ভূমিদস্যু এভাবে পেশিশক্তি প্রদর্শন এবং অবৈধ স্থাপনা তৈরির সাহস পায়, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
এই ঘটনা পরিবহন ও আবাসন খাতে বিদ্যমান অরাজকতার একটি বড় প্রতিফলন। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের পর বিভিন্ন সম্পদ দখলের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করার একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার সুযোগ করে দিচ্ছে। সালমান মুক্তাদিরের মতো একজন তরুণ উদ্যোক্তার স্টুডিও ভাঙচুর কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং এটি আইনের শাসনের অভাব ও ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যের চরম বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যতে এই ধরনের সহিংসতা রোধে কেবল গ্রেপ্তার নয়, বরং দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধার এবং নাজিমুদ্দিনের মতো তথাকথিত ব্যবসায়ীদের সকল অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং পেশিশক্তির দাপট আরও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। তবে এ ঘটনায় দখল ও পাল্টা দখলের সঙ্গে বিএনপির কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সরাসরি সম্পৃক্ততা নাই। স্থানীয় জায়গা জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ঘটনাটি ঘটেছে---