প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 12, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Sep 4, 2026 ইং
বরগুনায় মাদকের ভয়াল থাবা: বিস্তার ও আত্মহত্যা: উদ্বেগে তরুণ প্রজন্ম

মাদকের বিস্তার ও আত্মহত্যা: উদ্বেগে তরুণ প্রজন্ম
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: উপকূলীয় জেলা বরগুনায় মাদকের বিস্তার, কিশোর-তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং আত্মহত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। জেলা শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ইয়াবা ও গাঁজার বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে খুচরা কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও মাদকের মূল সরবরাহকারী ও অর্থের জোগানদাতারা অনেক ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাদক কারবারে নারী ও কিশোর-তরুণদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি বামনায় সালমা বেগম নামে এক নারীকে মাদকসহ আটকের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বড় চালানের সন্ধান পাওয়ার বিষয়টি এ প্রবণতাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী তরুণদের মাদক সেবন ও কারবারে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যার পর শহরের কিছু আবাসিক ও জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে কিছু তরুণ চুরি, ছিনতাই ও ভাঙচুরের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের বিস্তারের সঙ্গে জেলার উপকূলীয় ও নৌপথ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার নয়—মাদকের উৎস, সরবরাহ চেইন, অর্থের জোগানদাতা এবং বড় কারবারিদের শনাক্ত করতে সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতা প্রয়োজন। এদিকে মাদকের পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, হতাশা, সামাজিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে বরগুনায় আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। জুনের শুরুতে বরগুনা শহরের থানাপাড়া এলাকায় জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে এক নারী ও তার দুই শিশুকন্যার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরে ১৪ জুন তালতলী থানার ব্যারাকে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল ফারুক গাজীর মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় আসে। প্রাথমিক তথ্যমতে, গত জুন মাসের প্রথম ১৭ দিনের ব্যবধানে বরগুনায় ২১টি লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে; এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৯ জনের মৃত্যু আত্মহত্যাজনিত বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব মৃত্যুর কারণ এককভাবে মাদক—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পারিবারিক বিরোধ, প্রেম ও বিয়েকে কেন্দ্র করে চাপ, হতাশা এবং আর্থিক-সামাজিক অনিশ্চয়তাও বিভিন্ন ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ও আত্মহত্যা—দুই সংকটের ক্ষেত্রেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং, উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত সহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি মাদকের মূল সরবরাহ চেইন শনাক্ত, উপকূলীয় ও নৌপথে নজরদারি বৃদ্ধি এবং বড় কারবারিদের আইনের আওতায় আনার দাবি রয়েছে। বরগুনার মাদক পরিস্থিতি ও আত্মহত্যার ঘটনাগুলো তাই বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও আত্মবিনাশের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered