
জাহিদুল ইসলাম মেহেদী, বরগুনা প্রতিনিধি: ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বরগুনা পৌর শহরে দেখা দিয়েছে তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট। পৌর এলাকার দুই শতাধিক টিউবওয়েলের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি। ফলে খাবার পানি সংগ্রহে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌরবাসী। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষকে বাড়তি টাকা দিয়ে পানি কিনে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। বরগুনা পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা শহরের বাসিন্দাদের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণে ১৯৯৮ সালে খাকদোন নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের জন্য শহরের ক্রোক এলাকায় একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে সে সময় গ্রাহকসংখ্যা কম থাকায় পরিচালন ব্যয় ওঠেনি। পরে ২০১২ সালে শোধনাগারটি বন্ধ হয়ে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় পৌরসভা।
বর্তমানে বরগুনা পৌর এলাকায় ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন। তাদের পানির চাহিদা পূরণে প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ লিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে পৌর এলাকার টিউবওয়েলগুলোতেও। অনেক টিউবওয়েল থেকে পানি ওঠা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে! পৌরবাসীর অভিযোগ, একসময় কয়েকটি বাড়ি পরপরই টিউবওয়েল থাকায় সেখান থেকেই খাবার পানি সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু এখন অধিকাংশ টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়ায় দূরবর্তী এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাজার থেকে বোতলজাত পানি কিনছেন।
বরগুনা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হাসান বলেন, পৌর শহরে তিন-চারটি বাড়ি পরপর একটি করে টিউবওয়েল ছিল। এসব টিউবওয়েল থেকেই আমরা খাবার পানি সংগ্রহ করতাম। এখন কোনো টিউবওয়েল থেকেই ঠিকমতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ভয়াবহ পানি সংকট তৈরি হয়েছে।’
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইমরান ও নোমান বলেন, টিউবওয়েল থেকে পানি না ওঠায় পৌর এলাকার বাইরে থেকে পানি আনতে হচ্ছে। প্রতি কলস পানি আনতে ২০ টাকা করে দিতে হয়। অনেক সময় টাকা দিয়েও পানি পাওয়া যায় না।’
পিটিআই এলাকার বাসিন্দা খলিল বলেন, বাড়ির সামনে থাকা একটি টিউবওয়েল থেকে এলাকাবাসী প্রায় ৩০ বছর ধরে পানি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এখন সেই টিউবওয়েল থেকেও পানি ওঠে না।
পানি সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। অনেক পরিবারকে প্রতিদিন অতিরিক্ত টাকা খরচ করে পানি কিনতে হচ্ছে। এতে সংসারের অন্যান্য খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
পৌর শহরের ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, ‘সারা দিনে যে পরিমাণ পানি পাই, তা দিয়ে দুজন মানুষের গোসলও হয় না। চাহিদা পূরণ করতে ৩০ টাকা দিয়ে এক কলস পানি কিনতে হয়।’
একই এলাকার বাসিন্দা মো. শিমুল বলেন, পানি সংকটের কারণে পৌর শহরে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
অন্যদিকে পৌরবাসীর পানি সংকট নিরসনে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের বাগানবাড়ি রোড ও থানাপাড়া রোডে দুটি উঁচু জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি জলাধারের ধারণক্ষমতা ১০ লাখ লিটার। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জলাধার দুটির উদ্বোধন করা হলেও সেখান থেকে এখনো নিয়মিত পানি সরবরাহ শুরু হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এলজিইডি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে জলাধার দুটির নির্মাণকাজ শুরু করে বরগুনা পৌরসভা। নির্মাণ শেষে উদ্বোধন করা হলেও পাইপলাইনসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে সেগুলো থেকে পানি সরবরাহ চালু করা সম্ভব হয়নি। পৌরসভার আমতলাপাড় এলাকার বাসিন্দা আল মামুন বলেন, পৌরসভার টিউবওয়েলগুলো থেকে পানি ওঠে না। এ কারণে আমরা তীব্র সংকটে আছি। উঁচু জলাধার দুটি চালু করা হলে এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান হতো।
পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় টিউবওয়েলগুলোতে পানি পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জলাধার। ফলে সরকারি অর্থে অবকাঠামো নির্মাণ হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
এদিকে জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সাবেক নেতা ও বরগুনা পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুরাদ খান বলেন, পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট দূর করতে দুটি উঁচু জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু পাইপলাইনের সমস্যার কারণে সেগুলো থেকে পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আমরা এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।
পৌরবাসীর দাবি, শুধু সাময়িকভাবে পানি সরবরাহ নয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দ্রুত পানি শোধনাগার ও নির্মিত জলাধারগুলো সচল করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পৌর শহরের নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।