প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 12, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Aug 11, 2026 ইং
বরগুনায় অস্তিত্ব সংকটে রাখাইন সম্প্রদায় কমছে বসতি, হারাচ্ছে মাতৃভাষা ও ঐতিহ্য

বরগুনা জেলা প্রতিনিধি: সমুদ্র, নদী-খাল আর সবুজে ঘেরা বরগুনার উপকূলে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছে রাখাইন সম্প্রদায়। নিজেদের ভাষা, ধর্ম, পোশাক, তাঁতশিল্প ও উৎসবের মাধ্যমে তারা উপকূলীয় জনপদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে। তবে সময়ের সঙ্গে কমছে তাদের বসতি ও জনসংখ্যা, বদলে যাচ্ছে পেশা; নতুন প্রজন্মের মধ্যেও কমছে মাতৃভাষার ব্যবহার। বরগুনার তালতলী ও সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নে এখনো রাখাইন পল্লী রয়েছে। কৃষি, তাঁত, কুটিরশিল্প ও পশুপালন ঐতিহ্যগতভাবে তাদের জীবিকার অংশ। বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার, জলক্রীড়া, ফানুস ওড়ানো, নৃত্য ও লোকজ উৎসব তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একসময় পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক রাখাইন বসবাস করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা অনেক কমেছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইন জনসংখ্যা ২ হাজার ২৭১ জন উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তালতলী উপজেলা প্রশাসনের তথ্যে ১৩টি রাখাইন পাড়ায় প্রায় ৩ হাজার মানুষের বসবাসের কথা বলা হয়েছে। তথ্যের এই পার্থক্য থেকেই হালনাগাদ ও নির্ভুল জনশুমারির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পও সংকটে। কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় ও বাজার সংকটে অনেক পরিবার এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা, কর্মসংস্থানের জন্য পল্লীর বাইরে চলে যাওয়া এবং আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে তরুণদের মধ্যে রাখাইন ভাষার ব্যবহার কমছে।
ভূমি হারানো, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বসতি সংকোচনও তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ষাটোর্ধ্ব চিনোমেন রাখাইনের আশঙ্কা, মানুষ থাকলেও একদিন হয়তো তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে পারে। তবে সংকটের মধ্যেও ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। তালতলী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাখাইন পরিবারকে হ্যান্ডলুম, সেলাই মেশিন, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ছাতনপাড়ায় ‘ভাষা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৌদ্ধবিহার ও শ্মশানঘাট সংস্কারেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচ্ছিন্ন সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ভূমি ও বসতির নিরাপত্তা, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ, তাঁত ও হস্তশিল্পের বাজার সম্প্রসারণ, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণ করা গেলে উপকূলের এই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
রাখাইনরা শুধু একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়, তারা বরগুনার উপকূলীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত অংশ। তাদের ভাষা, তাঁত ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা মানে সংরক্ষণ করা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered