প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jul 26, 2026 ইং
বরগুনায় ভূমি সংকট প্রকট: নদীভাঙন,জালদলিল ও খাসজমি দখলে জনভোগান্তি!

বরগুনা জেলা প্রতিনিধি: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদ-নদী ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জেলা বরগুনায় দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে ভূমি-সংক্রান্ত নানা সমস্যা। নদীভাঙন, জাল দলিল, খাসজমি দখল, ভূমি রেকর্ডের অসঙ্গতি, দীর্ঘসূত্রিতার মামলা এবং সরকারি খাল-জলাশয় দখলের মতো সমস্যায় দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার হাজারো মানুষ। জানা গেছে, বিষখালী, বলেশ্বর, পায়রা ও অন্যান্য নদীর তীব্র ভাঙনে প্রতিবছর শত শত একর কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার বারবার বসতবাড়ি স্থানান্তর করতে বাধ্য হচ্ছে, আবার অনেকেই ভূমিহীন হয়ে পড়ছেন।
এদিকে নতুন জেগে ওঠা চর ও সরকারি খাসজমি দখলকে কেন্দ্র করে প্রায়ই অভিযোগ উঠছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি মহল বিভিন্ন কৌশলে সরকারি জমি দখল করে ভোগদখলে রাখলেও প্রকৃত ভূমিহীনরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভূমি রেকর্ডের ভুল, পুরোনো খতিয়ান, সীমানা নির্ধারণে অসঙ্গতি এবং ডিজিটাল রেকর্ডে ত্রুটির কারণে একই জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক ব্যক্তি দাবি করছেন। এতে ভূমি অফিস ও আদালতে মামলা বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া জাল দলিল, ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ও জাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমি আত্মসাতের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন মামলা চললেও দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
গ্রামীণ এলাকায় জমির সীমানা নিয়ে বিরোধও নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে সরকারি খাল ও জলাশয় দখল ও ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে ক্ষতিপূরণ ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগেও প্রতিবছর কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
পাথরঘাটা উপজেলা ভূমি কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মো. শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, সঠিক ভূমি রেকর্ড সংরক্ষণের ঘাটতি, দীর্ঘসূত্রিতা এবং অসাধু চক্রের তৎপরতার কারণেই অধিকাংশ বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি ডিজিটাল রেকর্ড হালনাগাদ, দ্রুত নামজারি, স্বচ্ছ জরিপ, প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি বণ্টন এবং জাল দলিল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বরগুনা জেলা ভূমি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, বরগুনার ভূমি সমস্যা শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাও। ভূমি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রেকর্ড ব্যবস্থা চালু এবং জনগণের অংশগ্রহণে ভূমি সেবা সহজ করা সময়ের দাবি। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বরগুনার ভূমি সংকট নিরসনে নির্ভুল ও হালনাগাদ ভূমি রেকর্ড, সরকারি খাসজমির স্বচ্ছ বণ্টন, জাল দলিল চক্র দমন, নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ, খাল-জলাশয় দখলমুক্তকরণ এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered