প্রিন্ট এর তারিখঃ Jul 30, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jul 3, 2026 ইং
বরগুনায় বিচারকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাৎ: এপিপি শহিদুল ইসলাম

বরগুনা জেলা প্রতিনিধি: বরগুনায় চেক ডিজঅনার মামলার রায়ের টাকা বিচারকের স্বাক্ষর নকল করে কৌশলে আত্মসাৎ করেছেন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) শহিদুল ইসলাম, যা নিয়ে বিচারিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বরগুনা জেলা বিচারিক আদালতে এক নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে খোদ সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) শহিদুল ইসলাম বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল নকল করে আদালতের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। ২০২২ সালে দায়ের করা একটি চেক ডিজঅনার মামলায় ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ আদালত আসামিকে টাকা পরিশোধের রায় প্রদান করেন। মামলার আসামি আবু হানিফ আদালতের মাধ্যমে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা দিলেও, আইনি জটিলতা ও বিচারক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে এপিপি শহিদুল ইসলাম অত্যন্ত সুকৌশলে জাল পেমেন্ট অর্ডার তৈরি করেন। তিনি গত ৯ ফেব্রুয়ারি জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে সেই ভুয়া নথি জমা দিয়ে পুরো অর্থ হাতিয়ে নেন। এই জালিয়াতিটি তখন সামনে আসে যখন মামলার প্রকৃত বাদী সতীন্দ্রনাথ বালা এবং তার আইনজীবী পেমেন্ট অর্ডার গ্রহণ করতে হিসাবরক্ষণ অফিসে উপস্থিত হন। বিচারকের হুবহু স্বাক্ষর নকল থাকায় হিসাবরক্ষণ অফিসও প্রাথমিকভাবে কোনো সন্দেহ না করেই চেক ইস্যু করে, যার ফলে প্রকৃত পাওনাদার তার পাওনা থেকে বঞ্চিত হন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ভুক্তভোগী মৎস্য ব্যবসায়ী সতীন্দ্রনাথ বালা এবং তার আইনজীবী মশিউর রহমান নেপোলিয়ান জানান, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর রায় পেলেও এপিপির এমন ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডে তারা এখন দিশেহারা। মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, পেমেন্ট অর্ডারে সাবেক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ওসমান গণি এবং তার স্টেনোগ্রাফার আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্বাক্ষর হুবহু নকল করা হয়েছে। স্টেনোগ্রাফার আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, বিষয়টি জানার পরপরই বিচারক নথিপত্র জব্দ করার নির্দেশ দেন এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে ঘটনার লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন। ভুক্তভোগী বাদী আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, ব্যবসায়িক ক্ষতির পর আইনি সহায়তা পাওয়ার আশায় আদালতে এসে তিনি উল্টো জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। একইভাবে আসামিপক্ষের আইনজীবী আমির হোসেন রিপনও এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, আদালতের একজন দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন জালিয়াতি সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকারকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। তিনি অবিলম্বে টাকা উদ্ধার ও দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অভিযুক্ত এপিপি শহিদুল ইসলাম তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আসার বিষয়টি স্বীকার করলেও এটি কোনো জালিয়াতি নয় বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে অনেকে অবগত থাকায় কেউ হয়তো ভুলবশত টাকা পাঠিয়ে থাকতে পারে, যা তার জালিয়াতির অভিযোগকে আড়াল করার একটি দুর্বল প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির আহ্বায়ক ও পাবলিক প্রসিকিউটর নুরুল আমিন এই ঘটনাকে অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং পেশাদারিত্বের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আদালত এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের ব্যাখ্যা পাওয়ার পর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিচার বিভাগীয় নথিপত্র ও স্বাক্ষর জালিয়াতির এই ঘটনা বিচারিক প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নজরদারির অভাবকেও সামনে নিয়ে এসেছে, যার ফলে হিসাবরক্ষণ অফিসের কার্যপদ্ধতি ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই জালিয়াতির প্রভাব শুধুমাত্র একটি মামলার রায়ের ওপর সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পুরো বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থায় চিড় ধরিয়েছে। একজন সরকারি আইন কর্মকর্তা যখন নিজেই আইনের আশ্রয় নিয়ে প্রতারণা করেন, তখন বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঘটনার বিচার না হলে ভবিষ্যতে আদালত অঙ্গনে এমন জালিয়াতির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। বরগুনা আদালতের এই ঘটনাটি কেবল একটি আর্থিক অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রপক্ষের আইনি কর্মকর্তাদের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ চিত্র। আদালত ও বার অ্যাসোসিয়েশন এখন কতটা স্বচ্ছতার সাথে এই অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ মানুষ, কারণ আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে ন্যায়বিচার সুদূরপরাহত হয়ে পড়বে।
© Copyright © dailyseshkatha © Seshkatha News24 © 2026 all rights reservered